সিঙ্গাপুরের নদী-ড্রেজিং ও বালু-আমদানি প্রস্তাব: চার আমলে চারবার আলোচনা

বাংলাদেশের নদীগুলো পলিতে ভরাট হয়ে প্রতিবছর বন্যা, ভাঙন ও নৌ-চলাচল বন্ধের কারণ হচ্ছে। এই সংকট সমাধানে সিঙ্গাপুর অন্তত চারবার প্রস্তাব দিয়েছিলো: নিজ খরচে ড্রেজিং করবে, বালু নিয়ে যাবে, সঙ্গে রয়্যালটিও দেবে। কিন্তু প্রতিবারই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত দুর্বলতায় তা ভেস্তে যায়।

  1. সিঙ্গাপুর কী দিতে চেয়েছিলো?

    সিঙ্গাপুর ল্যান্ড রিক্লেমেশনের জন্য বছরে কোটি কোটি ঘনমিটার বালু আমদানি করে। বাংলাদেশকে দেওয়া প্রস্তাব ছিলো তিন ধাপে:

    • বিনামূল্যে ড্রেজিং: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ড্রেজিংয়ের পুরো খরচ সিঙ্গাপুর বহন করবে।
    • বালু পরিবহন ও ক্রয়: ড্রেজিংয়ে ওঠা বালু সিঙ্গাপুর নিজ খরচে জাহাজে তুলে নিয়ে যাবে।
    • রয়্যালটি প্রদান: প্রতি ঘনমিটার বালুর জন্য বাংলাদেশকে রয়্যালটি দেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালের কমিটির হিসাবে, ১ কোটি টন বালু রপ্তানি করে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব ছিলো।
  2. প্রথম দফা: ১৯৯১-১৯৯৬ বিএনপি সরকার

    খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের সময় সিঙ্গাপুর প্রথম প্রস্তাব দেয়। তখন বালু রপ্তানির নীতিমালা ছিলো না। পানিসম্পদ, বিআইডব্লিউটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় হয়নি। Eco-Business-এর রিপোর্টে উল্লেখ আছে, মালয়েশিয়া ১৯৯৭ সালে এবং ইন্দোনেশিয়া ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুরে বালু রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। ওই সময় বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের নাম আলোচনায় আসে, কিন্তু চুক্তি হয়নি।

  3. দ্বিতীয় দফা: ২০০৭-২০০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকার

    সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিঙ্গাপুর আবার আগ্রহ দেখায়। Wikipedia-র ‘Sand smuggling in Southeast Asia’ নিবন্ধে বলা আছে, ইন্দোনেশিয়া ২০০৭ সালে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পর সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের দিকে ঝোঁকে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল ম্যান্ডেট ছিলো “সুষ্ঠ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা।” বড় অর্থনৈতিক চুক্তি তাদের এখতিয়ারের বাইরে ছিলো। তাই প্রস্তাব আলোচনার টেবিলেই থেকে যায়।

  4. তৃতীয় দফা: ২০১৪ সাল, আওয়ামী লীগ সরকার

    ২০১৪ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৮ সদস্যের কমিটি করে। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ Eco-Business-এ প্রকাশিত ‘Committee identifies eight rivers to export sand’ রিপোর্ট অনুযায়ী, কমিটি পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, গোমতী ও ফাজিলপুর খাল চিহ্নিত করে রপ্তানির জন্য।

    Eco-Business-এর ওই রিপোর্টেই আরও বলা হয়, ২২ জুলাই ২০১৪ বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন কমিটি গঠন করেন। সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে রপ্তানির জন্য বেশ কয়েকজন রপ্তানিকারক ইতিমধ্যে আবেদনও করেছিলো। স্থানীয় রপ্তানিকারকরা ১ কোটি টন বালু রপ্তানি করে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনার কথা জানায়। কিন্তু “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন” দুর্বল, পরিবেশ ছাড়পত্র জটিলতা, আর স্থানীয় বালু সিন্ডিকেটের বাধায় চুক্তি হয়নি।

  5. চতুর্থ দফা: ২০১৭ সালের আলোচনা

    ১৪ জুলাই ২০১৭ The Daily Star-এর ‘Bangladesh should stop river dredging’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের উচিত “সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে রিক্লেমেশন বালু রপ্তানির জন্য স্বল্পমেয়াদী অপারেশন দ্রুত শেষ করা”। অর্থাৎ ২০১৭ সালেও রপ্তানির পরিকল্পনা চলছিলো।

    একই বছর Prothom Alo-র ‘ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বালু বিদেশে রপ্তানি?’ মতামত কলামে প্রশ্ন তোলা হয়, “সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপ যে কারণে বালু আমদানি করতে চায়, সেই একই কারণে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের নতুন ভূমি গড়ে তুলে আয়তন বৃদ্ধির জন্য বালুর দরকার নেই?”

    The Daily Star-এর ২০১৭ সালের ওই রিপোর্টেই আরও বলা হয়, কম্বোডিয়া সিঙ্গাপুরে বালু রপ্তানি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে কারণ ড্রেজিংয়ে “immense environmental damage” হয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন। শেষ পর্যন্ত পরিবেশগত ঝুঁকি ও নীতিগত অস্পষ্টতায় ২০১৭-এর উদ্যোগও থেমে যায়।

  6. ফলাফল

    সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে মিয়ানমার, ফিলিপাইন থেকে বালু নেয়। ২০২৫ সালের ২০ মার্চ The Business Standard-এর রিপোর্ট জানায়, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর অবৈধ বালু উত্তোলন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোস্ট গার্ড ৭৬টি ড্রেজার ও ১০৬টি বাল্কহেড জব্দ করেছে। সরকার বৈধ বালুমহাল থেকে বছরে মাত্র ১ কোটি টাকা রাজস্ব পায়।

উপসংহার

৯০-এর বিএনপি, ২০০৭-০৮ তত্ত্বাবধায়ক, ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগ, এমনকি ২০১৭ সালেও — চারবার সিঙ্গাপুরের প্রস্তাব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভেস্তে গেছে। Eco-Business ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪The Daily Star ১৪ জুলাই ২০১৭Prothom AloThe Business Standard ২০ মার্চ ২০২৫ — সব রিপোর্টই এটা নিশ্চিত করে। সমন্বিত নীতি না হলে ভবিষ্যতেও এমন সুযোগ হাতছাড়া হতেই থাকবে।

ভাব-গাম্ভীর্যের জন্মগত অভিনেতা, বিতর্ক আর লিগ্যাসি

Kevin Spacey-কে আমার দারুন লাগে। মনে হয় ভাব-গাম্ভীর্য নিয়েই জন্মেছে এই মানুষ! হলিউড হয়তো অলিখিতভাবে বয়কট করেছে, কিন্তু তার কাজের প্রশংসা না করে উপায় নাই! একটা সময় ছিলো স্পেসিকে চিনতাম না, শুরু করলাম House of Cards দেখা — কি দুর্দান্ত অভিনয়! পরে IMDB হিস্ট্রি দেখে আবিষ্কার করলাম আমি The Usual Suspects, L.A. Confidential, The Negotiator, The Life of David Gale, Se7en, Horrible Bosses সিনেমাগুলোতে দারুন রেটিং দিয়েছি।

শুরুটা কোথায়? সংক্ষিপ্ত জীবনী

Kevin Spacey Fowler জন্ম ২৬ জুলাই ১৯৫৯, নিউ জার্সিতে। বাবা টেকনিক্যাল রাইটার, মা সেক্রেটারি। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার পাগল। Juilliard School-এ পড়াশোনা, ১৯৮১ সালে ব্রডওয়েতে অভিষেক। ৮০-র দশক পুরোটা স্টেজে কাটিয়ে ১৯৯০-এ ফিল্মে ব্রেক পান Glengarry Glen Ross-এ ছোট রোলে। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি।

যে রোলগুলো আইকন বানিয়েছে

  • The Usual Suspects (1995): Verbal Kint। ল্যাংড়া, নিরীহ, তোতলা। শেষ ৫ মিনিটে হলিউডের ইতিহাসের সেরা টুইস্ট দেন। অস্কার – Best Supporting Actor। এই রোলেই বুঝিয়ে দেন, “ভাব-গাম্ভীর্য” মানে চিৎকার না, কন্ট্রোল।
  • Se7en (1995): John Doe। স্ক্রিনটাইম ২০ মিনিট, কিন্তু ৭টা খুনের থিওলজি বুঝিয়ে পুরো ফিল্মের ভরকেন্দ্র হয়ে যান। ঠান্ডা গলায় বাইবেল আওড়ানো — আজও গা শিউরে ওঠে।
  • L.A. Confidential (1997): Det. Jack Vincennes। কোরাপ্ট হলিউড-কপ, ক্যামেরার সামনে হাসে, আড়ালে ডিল করে। নোয়া-র জগতে সবচেয়ে স্টাইলিশ রোল।
  • American Beauty (1999): Lester Burnham। মিড-লাইফ ক্রাইসিসে ভোগা বাবা। ব্যঙ্গ, বিষাদ, মুক্তি — সব একসাথে। অস্কার – Best Actor। “Look closer” ট্যাগলাইনটা Spacey-র ক্যারিয়ারের সারাংশ।
  • The Negotiator (1998): হোস্টেজ নেগোশিয়েটর Danny Roman। Samuel L. Jackson-এর সাথে ডায়লগ-ডুয়েল। টেনশন ধরে রাখার মাস্টারক্লাস।
  • The Life of David Gale (2003): ডেথ-রো-তে বসে ফিলোসফি কপচানো প্রফেসর। আইডিওলজি বনাম বাস্তবতা — Spacey ছাড়া এই রোল কেউ টানতে পারতো না।
  • House of Cards (2013-2017): Frank Underwood। “Democracy is so overrated” বলে চতুর্থ দেয়াল ভেঙে দর্শকের চোখে চোখ রাখা। নেটফ্লিক্সকে প্রেস্টিজ-TV-র ম্যাপে বসানোর কারিগর। এই রোলের জন্যই তাকে নতুন জেনারেশন চেনে।
  • Horrible Bosses (2011): Dave Harken। কমেডিতেও সমান সাবলীল। সাইকো বস হয়ে স্টিভ ক্যারেলদের জীবন নরক বানান, আমরা হাসতে হাসতে শেষ।

বয়কট: কেন হলিউড মুখ ফিরিয়েছে?

২০১৭-র অক্টোবরে #MeToo ঝড়ের সময় অভিনেতা Anthony Rapp অভিযোগ করেন, ১৯৮৬-তে ১৪ বছর বয়সে Spacey তাকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। এরপর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে আরও ১৫+ জন একই ধরনের অসদাচরণের অভিযোগ আনেন। কেউ বলেন কর্মক্ষেত্রে অশালীন মন্তব্য, কেউ বলেন শারীরিক হয়রানি।

ফলাফল: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Netflix House of Cards থেকে তাকে ছাঁটাই করে, S6-এর স্ক্রিপ্ট নতুন করে লেখে। Ridley Scott All the Money in the World থেকে Spacey-র সব সিন বাদ দিয়ে Christopher Plummer-কে দিয়ে ৯ দিনে রি-শ্যুট করে। এজেন্সি, পাবলিসিস্ট সবাই সম্পর্ক ছিন্ন করে। এটাই “অলিখিত বয়কট”।

আইনি পরিণতি: ২০২২-এ নিউইয়র্কের সিভিল কোর্টে Rapp-এর মামলায় জুরি Spacey-কে দায়মুক্তি দেয়। ২০২৩-এ লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে ৯টি ফৌজদারি অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পান। অর্থাৎ ক্রিমিনাল কনভিকশন হয়নি। তবু ইন্ডাস্ট্রি তাকে আর মূলধারায় ফেরায়নি। ২০২৩-এর পর ছোট ইন্ডি ফিল্ম Control, Peter Five Eight করেছেন, কিন্তু স্টুডিও ফিল্মে নেই।

শিল্পী বনাম ব্যক্তি: দর্শকের ডিলেমা

Spacey-র কেসটা ক্লাসিক “separate art from artist” বিতর্ক। অভিযোগগুলো গুরুতর, ভিক্টিমদের ট্রমা সত্যি। আবার আইনের চোখে তিনি দোষী প্রমাণিত হননি। দর্শক হিসেবে তুমি কী করবে? Se7en-এর John Doe-কে দেখে আজও গায়ে কাঁটা দেয়, American Beauty-র Lester-এর মনোলগ আজও কোট করি। এই কাজগুলো তো মিথ্যা হয়ে যায়নি।

Spacey নিজে বলেছেন, “I have a lot of respect for actors who keep their personal lives personal.” অথচ তার ব্যক্তিগত জীবনই ক্যারিয়ার খেয়ে দিয়েছে। ভাব-গাম্ভীর্য নিয়ে জন্মানো লোকটা ক্যামেরার সামনে গড-লেভেল কন্ট্রোল দেখান, কিন্তু ক্যামেরার বাইরে কন্ট্রোল হারিয়েছেন — অভিযোগ যদি সত্যি হয়।

শেষ কথা

হলিউড তাকে বয়কট করতে পারে, IMDB থেকে তার পেজ ডিলিট হবে না। Usual Suspects-এর লিম্প, House of Cards-এর সাউদার্ন ড্রল, Se7en-এর হিম-ঠান্ডা সার্মন — এগুলো ফিল্ম-স্কুলে পড়ানো হবে। তুমি তাকে ঘৃণা করতে পারো, ভালোবাসতে পারো, ইগনোর করতে পারো। কিন্তু ১৯৯৫-২০১৭ — এই ২২ বছর Spacey ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য “বুদ্ধিমান ভিলেন”।

বয়কট অলিখিত, কিন্তু লিগ্যাসি লিখিত। The Life of David Gale-এর ডায়লগ ধার করে বলি: “Fantasy is an exercise for the brain.” Spacey-র ফিল্মোগ্রাফি আমাদের ব্রেইনের জন্য সেই এক্সারসাইজ। ব্যক্তি Spacey-কে নিয়ে কোর্ট-রুম বিতর্ক চলুক, শিল্পী Spacey-কে নিয়ে ফিল্ম-রুম বিতর্ক চলবে আরও ৫০ বছর।

কারা ধ্বংস করল বাংলাদেশি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি?

বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্প এখন আক্ষরিক অর্থেই মৃত। কোনো নতুন সুপারহিট অ্যালবাম নেই, নেই কোনো বড় কনসার্ট বা জাঁকজমকপূর্ণ শো—আমার জানা মতে, পুরো ইন্ড্রাস্ট্রি যেন এক জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

গত সপ্তাহে বসুন্ধরা সিটিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরার সময় হঠাৎ মনে পড়লো, ওয়ারফেজ ব্যান্ডের শেষ অ্যালবামটি আমার কেনা হয়নি। বেশ একটা আবেগ নিয়ে লেভেল ৬-এর দিকে ছুটে গেলাম; মনে পড়েছিলো পুরোনো দিনের কথা, যখন এই ফ্লোরটিতে দেশি-বিদেশি গানের দারুণ কালেকশন নিয়ে বেশ কিছু চমৎকার মিউজিক শপ গমগম করতো। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি হতবাক! সব মিউজিক শপ উধাও হয়ে গেছে, আর সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন আর এক্সেসরিজের দোকান। একটু আশার আলো নিয়ে আমার বাসার কাছাকাছি উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স এবং সাঈদ গ্র্যান্ড সেন্টারে গেলাম, যেখানে একসময় নামী কিছু ক্যাসেট-সিডির দোকান ছিলো। দুর্ভাগ্যবশত, সেগুলোও পুরোপুরি হাওয়া। অনেক খোঁজাখুঁজির পর টিকে থাকা একমাত্র দোকানটির সন্ধান পেলাম, কিন্তু সেখানেও আমার কাঙ্ক্ষিত এলবামটি ছিলো না।

তাহলে একজন সঙ্গীতপ্রেমী কোথায় পাবে মিউজিক সিডি?
এই প্রশ্নটা যখন এক বন্ধুকে করলাম, সে খুব স্বাভাবিকভাবেই পরামর্শ দিলো — আমার আইএসপির এফটিপি সার্ভারে ঢুকে যেন গানটা খুঁজে নি। আমার পাঠকরা খুব ভালো করেই জানে যে আমি কখনো পাইরেটেড বা চোরাই গান শুনি না। বিশেষ করে যখন বিষয়টি বাংলাদেশি শিল্পীদের স্বার্থের সাথে জড়িত। আর আমি কোনো ধরনের পাইরেসিকে কখনোই প্রশ্রয় দিই না। স্বভাবতই, আমি এফটিপি সার্ভারে গানটি খুঁজিনি। কিন্তু বর্তমানে এটিই এখন শহরের সবচেয়ে বড় ‘টক অব দ্য টাউন’। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে তাদের আইএসপি-র কাছে সিনেমা, গান, সফটওয়্যার আর গেমসের এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। এখন আর কেবল ছোটখাটো পাড়া-মহল্লার আইএসপিগুলোই এটি করছে না; বড় বড় কর্পোরেট আইএসপিগুলোও তাদের গ্রাহকদের খুশি রাখতে এই পাইরেটেড কালেকশনের বিশাল স্তূপ মেইনটেইন করছে। অনেক ব্যবহারকারী এতে হয়তো খুবই খুশি, কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ব্যাপারটা এমন হওয়া মোটেও উচিত না।

এই পতনের শেকড় কিন্তু অনেক গভীরে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিলো একটি সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক কাঠামোর ওপর। সারগাম, সাউন্ডটেক, সঙ্গীতা বা জি-সিরিজের মতো বড় বড় রেকর্ড কোম্পানিগুলো আর্টিস্ট বা শিল্পীদের সাথে কেবল সাময়িক চুক্তিভিত্তিক কাজ করতো। অনেকসময় বিক্রি ভালো হলে আরও একটু টাকা দিতো। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন সবসময়ই দুর্বল এবং এর প্রয়োগ না থাকায়, এই চুক্তিগুলো কখনো শিল্পীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বা টেকসই কোনো ক্যারিয়ার হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। আইনি সুরক্ষার এই অভাব নব্বইয়ের দশকে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম দেয়। অডিও ক্যাসেটের জোয়ারে রাতারাতি ব্যাঙের ছাতার মতো অগণিত মিউজিক কোম্পানি গজিয়ে ওঠে। এই মৌসুমি কোম্পানিগুলো বাজারে এসে বড় জোর ১/২টা হিট গান দিতো, কিংবা ১/২টা মিক্সড অ্যালবামের ট্রেন্ডে ব্যবসা করে রাতারাতি উধাও হয়ে যেতো। ফলে ইন্ডাস্ট্রি যেমন ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তেমনি শিল্পীরাও চরমভাবে শোষিত হন।

প্রায় এক দশক আগে আমি “Who Killed the Electric Car?” নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছিলাম। সেখানে দেখানো হয়েছিলো কীভাবে পুঁজিবাদী জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো ইলেকট্রিক কারকে কখনো আলোর মুখ দেখতে দিতে চায়নি। কিন্তু আজকের দিনের দিকে তাকান: মার্কিন সরকার এখন ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য ‘ইনডাকশন চার্জিং’ প্রযুক্তিসম্পন্ন আলাদা হাইওয়ে লেন তৈরীর পরামর্শ দিচ্ছে। প্রগতির চাকা এভাবেই ঘোরে, আর এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি—একদিন আমাদের মিডিয়া বা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

তবে সেই সুদিনের জন্য আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করা জরুরী। আমাদের অন্যের বা বিদেশী কাজের কপিরাইটকেও সম্মান করতে শিখতে হবে। বাংলাদেশ একটি ছোটো দেশ, যেখানে বিপুল জনসংখ্যার মুখের খাবার জোগাতে হয়। আমরা যদি অন্যের মেধা বা কপিরাইটকে সম্মান করতে না শিখি, তাহলে বিশ্ব সম্প্রদায়ও আমাদের ঠিক একইভাবে অসম্মান করবে এবং আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান কোনো সৃষ্টি থেকে আমাদের বঞ্চিত করবে — যা আমাদের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। যতদিন না আমরা অন্যের সৃষ্টির মূল্যায়ন করতে শিখবো, ততদিন এই মিউজিক শপগুলো খালিই পড়ে থাকবে, আর আমাদের ইন্ডাস্ট্রির নীরবতা শুধুই দীর্ঘায়িত হবে।

ডাক্তার শায়লা শামিম ও মনোয়ারা হাসপাতালের অভিজ্ঞতা

Tags

পৃথিবীতে মা হওয়া একই সাথে বিশাল একটা সুখের এবং কষ্টের কাজ। আমরা ছেলেরা এই বিষয়টা বাহির থেকে দেখি। আনন্দ পাই, কিন্তু মেয়েরা যে পরিমান কষ্ট সহ্য করে একটা বাচ্চা এই পৃথিবীতে আনে যা কখনই বুঝতে পারবো না। আমার বন্ধু তালিকার সবাই প্রায় তরুণ। অনেকেই নতুন বিয়ে করছে, সামনেই তাদের ঘর আলো করে বাচ্চা আসবে। আমাদের সবার এই কথাটা মনে রাখা উচিৎ যে আমাদের অর্ধাঙ্গিনীরা এই ৯টা মাস অনেক কষ্ট করে পার করবে। আমরা হয়ত শরীরের কষ্ট কমাইতে পারবো না কিন্তু তাদের মন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারবো। একই সাথে আমাদের ভবিষ্যৎকরনীয় বিষয়গুলো নিয়েও সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশ যেহেতু, সবার প্রথম যথেষ্ট পরিমান টাকা জমিয়ে রাখতে হবে হাতে। নিয়মিত ডাক্তার এর চেকআপ করাতে হবে। ঠিক মত খাওয়াদাওয়া করাতে হবে। কোন রকম ভারী কাজ করতে দেয়া যাবে না। কোথায় ডেলিভারি করাবেন, সেখানে কিভাবে নিয়ে যাবেন সেগুলো আগে থেকেই ঠিক করিয়ে রাখতে হবে।

অপদার্থের মত সব কিছু ডাক্তার এর হাতে ছেড়ে দিবেন না। কি হচ্ছে না হচ্ছে এই বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের প্রথম বাচ্চার জন্মের সময় আমরা অনেক কেয়ারফুল ছিলাম। কিন্তু তারপরও অনেক ভুল করে ফেলেছিলাম যার জন্য আমরা তাকে হারিয়েছি। এই কষ্ট সারাজীবনের। আপনারা ভুল করবেন না। বাংলাদেশ অনেক খারাপ একটা জায়গা। এখানে স্বাস্থ্য সেবা নয় ব্যবসা। এখানকার ক্লিনিক + ডাক্তারদের একটা বড় চেষ্টা থাকে প্রিম্যাচিউর বেবি জন্ম দেয়ার। এখানকার ডাক্তাররা কখনই আপনাকে নরমাল ডেলিভারির কথা বলবে না। নানা রকম ভয় দেখাবে যাতে সিজার করতে রাজি হন। কারন নরমাল ডেলিভারিতে তাদের ইনকাম কম। সিজার করলে ইনকাম বেশি হওয়ার একটা বিশাল সুযোগ থাকে।

আমার টাকার অভাব ছিল না, অভাব ছিল জ্ঞানের। বাসার কাছেই বলে নিয়ে গিয়েছিলাম সিদ্ধেশ্বরীর “মনোয়ারা হাসপাতাল” এ। ওখানকার ডিউটি ডাক্তার (যতদূর সম্ভব ইন্টার্ন) ঠিক ভাবে চেকআপ না করেই বলেছিল যে আমার স্ত্রীর ডেলিভারি পেইন উঠেছে। অথচ আমার স্ত্রীর সেই রকম ব্যাথাও ছিল না, পানিও ভেঙ্গে যায় নাই। সিজার করার জন্য ডাক্তার শায়লা শামিম (MBBS, FCPS (Obs & Gynae) Assitant Professor, Gynae & Obs. Bangabandhu Sheikh Mujib Medical University) যে কোন রাস্তা দিয়ে অপারেশন থিয়েটার এ গেলো তা আমি জানিই না। একবার আমার সাথে কথাও বলে নাই অপারেশন শুরুর আগে। অতীতে চেকাপের সময় উনাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম ম্যাডাম নরমাল ডেলিভারি ভালো নাকি সি-সেকশন ভালো। উনার ভদ্রতার মুখোশ খুলে উনি আমাকে বিশাল একটা ঝাড়ি দিয়েছিলেন যে আর কিছু বলি নাই।

যাই হোক আমার অজ্ঞতা আর উনাদের লোভ একটা বাচ্চার জীবন অনিশ্চিত করেই এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। ইবাদত (আমার প্রথম ছেলের নাম) এর জন্মের পর যখন আমাকে দেখানো হল তখন নার্সরা বললো বাচ্চা ভালো আছে, সব ঠিক আছে। আমিও আনন্দে খুশিতে উনাদের বখশিশ দিলাম। একটু পড়ে শিশু ডাক্তার তাহমিনা যিনি অপারেশন এর সময় উপস্থিত ছিলেন, উনি বের হচ্ছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে বাচ্চা আর মাকে কখন বাসায় নিতে পারবো। উনি অনেক রুডলি আমাকে বললেন, বাসায় নিবেন ? আপনার বাচ্চা বাঁচে কিনা সেইটা আগে দেখেন। উনার কথায় আমি হতভম্ব। মনে হলো সেকেন্ড এর মধ্যে জান্নাত থেকে জাহান্নামে এসে পড়লাম। উনি নিজে গজর গজর করতে করতে বের হয়ে গেলেন। একজন ডাক্তারকে মনে হয় শিক্ষা দেয়া হয় যে কিভাবে রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলা উচিৎ। বাংলাদেশ জন্য উনারা এই শিক্ষাটা ভুলে গেছেন।

বাচ্চাকে নিয়ে গেলো এনআইসিইউ তে। যেখানে আমাদের যেতে দেয়া হয় না, কথা বলার মত, কিছু জিজ্ঞাসা করার মতও কেউ নাই। আমি একবার এনআইসিইউ এর সামনে দৌড়াই আরেকবার পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে। একই সাথে কেবিন পাওয়ার জন্য এডমিনিস্ট্রেসন এ। বাচ্চার কি সমস্যা হইছে কিছুই জানি না। পুরো দিনটা এভাবে গেলো। রাতে শিশু ডাক্তার তাহমিনা আবার আসলেন। জানা গেলো আমার বাচ্চা সময়ের আগেই জন্ম নেয়ার কারনে তার ফুসফুস কাজ করছে না। তাকে আপাতত ইনকিউবেটর এ রাখা হয়েছে অক্সিজেন দিয়ে। তার অবস্থা ভালো না। কি বলবো মনের ভিতর যে কি যাচ্ছিল। কেবিন এ ফিরে জেরিনকে বললাম বাবু ভালো আছে। সব ঠিক আছে। এনআইসিইউ এর ঠিক সামনের কেবিনটা নিয়েছি যাতে বাচ্চার খোজখবর নেয়া যায়। রাতে চোখটা একটু বন্ধ করেছি ঠিক এই সময় নার্সরা ডাক দিল। এনআইসিইউ এর ভিতরে গিয়ে ডিউটি ডক্টর এর কাছে জানতে পারলাম, আমার বাচ্চার অবস্থা ভালো না, তাকে ইমিডিয়েট লাইফ সাপোর্ট এ দিতে হবে যে মেশিন তাদের এখানে নাই। জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় আছে। বললো ধানমন্ডির পেডিহোপ হাসপাতাল এ। (পরবর্তিতে জানতে পেরেছিলাম যে পেডিহোপ এর সাথে তাদের একটা লিয়াজো আছে)। বললাম বাচ্চাটাকে একটু দেখতে পারি। ছোট্ট একটা বাচ্চা, বুকটা উঠানামা করছে, মনে হচ্ছে একেবারে ভেঙ্গে যাবে। ওদেরকে বললাম এম্বুলেন্স রেডি করতে। আম্মুকে ফোন দিয়ে বললাম হাসপাতাল এ আসতে। বন্ধু শাওন আনোয়ারকেও ফোন দিয়ে আসতে বললাম। জেরিনকে বললাম শক্ত হইতে তোমার বাবুকে আমি অন্য হাসপাতাল এ নিয়ে যাচ্ছি। ১০ মিনিট এর মধ্যেই বাচ্চাকে নিয়ে রওনা দিলাম। রাস্তা ফাকা ছিল অনেক দ্রুতই পৌঁছে গেলাম পেডিহোপ নামের জঘন্য হাসপাতাল এ। ওরা ওরাই সবকিছু করে বাচ্চাকে লাইফ সাপোর্ট মেশিন এ দিয়ে দিল। আমাকে অফিস এ নিয়ে জানানো হইলো তাদের এইখানে প্রতিদিনের খরচ কি রকম এই সেই। হাসপাতাল এর অবস্থা দেখেই আমার মন চুপসায় গেছে। হাসপাতাল কম বস্তি বলাই বেটার।

সকাল বিকাল ডাক্তার আসে। একটা কথাই শুধু শুনি আপনার বাচ্চার অবস্থা ভালো না। কাচের জানালা দিয়ে দেখি আমার বাবুর বুক উঠানামা করছে। যতক্ষণ পারি তাকিয়ে থাকি। একটু গবেষণা করে জানা গেলো এই সমস্যার নাম RDS (Respiratory Distress Syndrome) এবং প্রথম চিকিৎসাই হল Surfactant therapy. দৌড়ে যাই ডিউটি ডাক্তার এর কাছে। তাকে বলি আমার বাচ্চাকে কি এইটা দেয়া হয়েছে কিনা। তার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে কথা বলি মেইন ডক্টর এর সাথে। সে বলে জন্মের ছয় থেকে বারো ঘণ্টার মধ্যেই দিতে হয়। এইটা দেয়ার দায়িত্ব মনোয়ারা হসপিটাল এর শিশু ডাক্তার তাহমিনার ছিল। ডাঃ তাহমিনাকে ফোন দিলে সে বলে মনোয়ারা হাসপাতালে নাকি সেই সুযোগ সুবিধা ছিল না। মনোয়ারা হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকলে জন্মের প্রথম ১২ ঘণ্টা বাচ্চাটাকে শুধু ইনকিউবেটর এ রেখে ওরা টেস্ট করতেছিল। তারপর ডাক্তারকে বলি বাচ্চার অবস্থা যখন এতোই খারাপ এখনও আমি সারফ্যাক্টান্ট থেরাপি দিতে চাই। যদি কিছু উন্নতি হয়। ডিউটি ডক্টর একটা ছোট কাগজের টুকরায় ওষুধের নাম লিখে দেয়। বলে ওষুধের দাম ২০-২৫ হাজার টাকা। এইজন্য তারা নাকি সবাইকে বলে না। তার কথা আর কাগজের হাতের লেখা দেখে আমি হতভম্ব। আর যাই হোক কোন প্রফেশনাল ডাক্তার এর হাতের লেখা সেইটা ছিল না।

ধানমন্ডির রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াই ওষুধের খজে আমি আর মাসুদ। অনেক খোজাখুজির পর পেয়ে যাই। বুকের মধ্যে একটু আশা বাড়ে, হয়ত আমার বাচ্চাটা সুস্থ হয়ে যাবে। ওষুধ নিয়ে এসে ডাক্তারকে বলি যে ওষুধ দেয়ার সময় আমি থাকতে চাই। এদের স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে ততক্ষণে ধারনা হয়ে গেছে। দামি ওষুধ যদি না দিয়েই বলে যে দিয়েছি। ওষুধ দেয়া হলো, আমার বুকে আর কোন সাহস অবশিষ্ট নাই। বন্ধু আনোয়ারকে আগে বারবার বলছিলাম অন্য কোন ভালো হাসপাতাল এ নেয়ার ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেটা দেখতে। কিন্তু ওষুধ দেয়ার সময় বুঝতে পারলাম যে লাইফ সাপোর্ট থেকে খুললে বাচ্চার শ্বাসপ্রসাস পুরো থেমে যায়। এই বাচ্চাকে নিয়ে আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ নাই। এক মিনিট নিঃশ্বাস নিতে না পারলে আমাদের কত কষ্ট হয়। তিনটা দিন আমার বাচ্চাটা এতো কষ্ট সহ্য করলো, আমি বাবা হয়ে ওর জন্য কিছু করতে পারলাম না। অবশেষে ডাক্তার জানালো তাদের আর কিছু করার নাই। আমি চাইলে শেষ বারের মত আমার ছেলেকে দেখতে পারি।

এপ্রোন পড়ে আইসিইউতে গেলাম। আমার বাবা চোখ বন্ধ করে ছিল। ওর কপালে একটু হাত রাখলাম। ও চোখ মেলে তাকালো। ওর চোখ দিয়ে দুই ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। এতোটুকু বাচ্চা ওই কি বুঝতে পেরেছিল যে বেঁচে থাকতে ওই কোনদিন ওর মায়ের বুকের আদর পাবে না। আমি আর কিছু দেখিনাই চোখে। সব কিছু ঘোলা হয়ে গেলো। বের হয়ে বললাম জেরিনকে যে করে হোক রিলিজ করিয়ে নিয়ে আসতে। জন্মের পর থেকে ও ওর বাচ্চাটাকে দেখতে পারে নাই। বন্ধুরা জেরিনকে এ্যাম্বুলেন্স এ করে নিয়ে আসলো জানিনা তখন আমার বাবা এই পৃথিবীতে আর ছিল কিনা। জেরিন আর আম্মু কাচের ফাঁক দিয়ে বাবুকে দেখে বাসায় চলে গেলো। তার কিছুক্ষণ পর সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে আমার সোনামনিটাকে আমার বুকে দিল। এতো সুন্দর হাসি মুখ নিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর এই সব কষ্ট থেকে ওই মুক্তি পেয়ে গেছে। বাপের কোলে তিনদিনের বাচ্চার দেহ যে কতটা ভারী হতে পারে তা আমি টের পাইলাম। বাসায় কেউ জানতো না। আমি আমার বাবাকে নিয়ে বাসায় আসলাম। জেরিন তো সাথে সাথেই পড়ে গেলো। বাচ্চার জন্য কাদবো না জেরিনকে সামলাবো বুঝতে পারছিলাম না। জেরিন এর বুকে ওর এতো কষ্টের ধন নিথর দেহটা দিলাম। আমি পারি নাই ওরা বাচ্চাটাকে বাচাইতে। আমি অনেক কিছুই জানতাম না। জানতাম না মনোয়ারা হাসপাতাল এতো খারাপ। জানতাম না পেডিহোপ হাসপাতাল এতো খারাপ। পরে কাউসার ভাইয়ের কাছে শুনি প্রায় একই ঘটনা। তিনিও মনোয়ারা – পেডিহোপ হাসপাতালের এই চক্রান্তে পড়তে ধরেছিলেন। কিন্তু তাদের জানা থাকায় তারা পেডিহোপ এ না নিয়ে নিজ দায়িত্তে স্কয়ার হাসপাতাল এ নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমাদের এই দেশে মানুষের জীবনের দাম নাই। ডাক্তাররা রোগীর কথা চিন্তা করে না। তারা চিন্তা করে বাচ্চা প্রিম্যাচিউর হলেই ব্যবসা। আইসিইউতে ঢুকাইতেই পারলেই লাখ লাখ টাকা ইনকাম। তাতে বাচ্চা বাচুক আর মরুক। তাদের মনের ভিতর একটা ফুটফুটে বাচ্চার জন্য এক ফোটা মায়া হয় না। অনেক হাসপাতাল এ তো শুনেছি ইঞ্জেকশন দিয়ে ডেলিভারী পেইন তুলে দেয় বাচ্চা প্রিমাচিউর করার জন্য।

অনেক হয় দেখে শেখে না হইলে নিজের জীবন দিয়ে শেখে। আমি আমার জীবন দিয়ে শিখেছি। পুরো লেখাটা লিখতে আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়েছে। আমার এই লেখা পড়ে যদি তোমরা কিছু শিখতে পারো তাহলেই আমার লেখা সার্থক হবে। নিজের বাচ্চার জন্মের সময় অনেক সতর্ক থাকা প্রয়োজন, সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। সবাই পারলে এই পেডিহোপ হাসপাতাল, মনোয়ারা হাসপাতাল, ডাক্তার শায়লা শামিম, তার সাথের শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ তাহমিনা এবং এদের মত সব ডাক্তারদের কাছে থেকে দূরে থাকবেন। এইসব বিষয়ে ইন্টারনেট এ অনেক লেখা আছে। এই লেখাগুলো পড়বেন। ডাক্তাররা বেশিরভাগ সময়ই ২ সপ্তাহ আগে অপারেশন করতে চায়। এই বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার। অনেক সময় বলে আপনার বাচ্চার ওজন বেশি তাই তারাতারি অপারেশন করতে হবে। জন্মের পর বলবে ওজন কম এইজন্য লাইফসাপোর্ট এ রাখতে হবে। এতো কিছু লাগে না। নরমাল ডেলিভারি সবচাইতে ভালো। বাচ্চা হওয়ার পরপরই মায়ের বুকে দেয়া উচিৎ এবং শালদুধ খাওয়াতে হবে। অনেক সময় মায়ের বুকে দুধ আসতে দেরি হয়। এইসময় দুধ না আসলেও বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে, বাচ্চা চুষলেই দুধ আসবে। এছাড়াও এই বিষয়ে সাহায্য প্রদান করে এমন একটি সংস্থা হচ্ছে বাংলাদশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন যা মহাখালিতে অবস্থিত। এদের প্রশিক্ষিত নার্সরা খুব সামান্য ফি এর বিনিময়ে আপনার বাসায় গিয়ে দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সাহায্য করবে। অনেক সময় দুধ এর শিরায় ব্লক থাকে, এইজন্য বাচ্চা দুধ পায় নাই। এইসব বিষয়ে BBF সবচাইতে ভালো সাহায্য করতে পারে। ভুলেও বাচ্চাকে ফর্মুলা বা পাউডার দুধ খাওয়াবেন না। এইটা বাচ্চার শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর। মায়ের বুকের দুধই শ্রেষ্ঠ খাবার। সবাই ভালো থাকবেন।

Original Post: http://on.fb.me/1B5kWLN

ই-কমার্স – বাংলাদেশ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ!

Tags

তথ্য প্রযুক্তি এখন মানব জীবনের একটি আবিছেদ্য অংশ। বিশ্বায়নের কল্যাণে উন্নত দেশের খোঁজখবর ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। তবে এই ক্ষেত্রে বাইরের বিশ্ব যেখানে অনেক অগ্রসর, বাংলাদেশ সেখানে অনেকটা পিছিয়ে আছে। ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যবহারের কারনে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে অনেক সহজ এবং দ্রুততর। ফলশ্রুতিতে ব্যবসা-বানিজ্যের প্রচার ও প্রসার ঘটছে দ্রুত। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ডিজিটাল যুগের সূচনা হয়েছে তারই পথ ধরে ই-কমার্স বা ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আমাদের দেশে ই-কমার্সের সূচনা নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে যখন ইন্টারনেট জনসাধারণের হাতে পৌঁছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ই-কমার্স বলতে আমরা কি বুঝি? সহজ ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে ইলেকট্রনিক কমার্স। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যখন ব্যবসা করা হয় তখন সেটা ই-কমার্স নামে পরিচিত হয়। এটা বিভিন্ন ভাবে গড়ে উঠতে পারে, যেমন: দু’টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (বি-টু-বি), বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (বি-টু-জি), বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতার মাঝে (বি-টু-সি), এমনকি ক্রেতা এবং ক্রেতার মাঝেও (সি-টু-সি) এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে পারে।

বাংলাদেশে বি-টু-বি এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি। এর কারন হচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর। তৈরি পোশাক শিল্পের ক্রেতাগণ সাধারণত ইন্টারনেটের মাধ্যমেই বিক্রেতার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে থাকে। উন্নতবিশ্বে বি-টু-সি এবং সি-টু-সি খুবই জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য হলেও বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমানে কিছু ওয়েবসাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে কেনাবেচার সুবিধাগুলো প্রদান করছে তবে তার পরিসর স্বল্প। এই অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে মনে করা হয় আমাদের দুর্বল প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে অনগ্রসরতা। এছাড়াও বাংলাদেশের ধীর গতির ইন্টারনেট সার্ভিস এবং আন্তর্জাতিক মানের পেমেন্ট গেটওয়ে না থাকার কারনেও উপরক্ত দুটি সেক্টর প্রসার লাভ করছেনা। কিন্তু এত প্রতিবন্ধকতা সত্তেও আশার আলো হিসেবে ইন্টারনেটে কেনাকাটা বা প্রয়োজনীয় জিনিসের তথ্য খুঁজে বের করা এখন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

যেসব ক্ষেত্রে আমরা এখন ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হচ্ছি তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিল পরিশোধ, হোটেল বুকিং, বিমানের টিকেট বুকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, নতুন-পুরাতন দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয়, রিয়াল এস্টেট ব্যবসা, গাড়ি বা অন্যান্য যানবাহন ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি। ঘরে বসেই মানুষ এখন বিভিন্ন সেবার যেমন: গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদির বিল পরিশোধ করতে পারে। এগুলো সম্ভব হয়েছে মোবাইল ব্যংকিং এর কারনে। এছাড়া সম্প্রতি মোবাইল ব্যংকিং এর মাধ্যমে টাকা পাঠানো জনপ্রিয়তা লাভ করেছে সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে। বিভিন্ন শপিংমলে এখন ইলেকট্রনিকালি বিল পরিশোধের ব্যবস্থা আছে। সুপারমার্কেটগুলোতে কার্ড পেমেন্টের ব্যবস্থা থাকায় ক্রেতারা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে বাজার করতে পারেন। উন্নত বিশ্বে মানুষ ঘরে বসেই তাদের নিত্য দিনের বাজার করছে অনায়াসে। ইবে, আমাজন ছাড়াও অনেক প্লাটফর্ম আছে যারা এই সুবিধা গুল প্রদান করে থাকে। আমাদের দেশে অনলাইনে কেনাবেচার জন্য বর্তমানে অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে যেমন: বিপনি, ইবিপনন, আইফেরি, রকমারী, প্রিয়শপ, লামুদি, ক্লিকবিডি, এখনি, উপহারবিডি, কারমুদি, গিফটবিডি, সামগ্রি, বিডিহাট, ইত্যাদি। এই ওয়েবসাইটগুলো থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বা উপহার সামগ্রী ঘরে বসেই ক্রয় করতে পারে।

উপরে যেসব ওয়েবসাইট গুলো উল্লেখ করা হয়েছে এগুলোর বাইরেও অনেক ওয়েবসাইট আছে যেগুলো একই সুবিধা প্রদান করে থাকে। তবে তুলনামূলক ভাবে এই সেক্টরটি এখনো বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। আমাদের দেশের ব্যংকিং ব্যবস্থা এখনো আশানুরূপ ভাবে নিরাপদ না। অনেক ব্যংক এখনো অনলাইন ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। সাধারণ মানুষের মাঝে কার্ড ব্যবহারের প্রচলন ও কম। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় যে, অনলাইনে কেনাকাটা যেমন সুবিধাজনক, এর কিছু খারাপ দিক ও আছে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের গুনাগুণ ঠিক থাকেনা, আবার গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার আশংকাও থাকে। তবে আশার কথা এই যে, নানাবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনলাইন কেনাকাটা বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। মোবাইল ইন্টারনেট এবং ওয়াই ফাই ইন্টারনেটের প্রসারের কারনে সর্বসাধারণের হাতের নাগালে ইন্টারনেট পৌঁছেছে। এখন প্রয়োজন মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি এবং বিক্রিত দ্রব্যাদির মান নিশ্চিতকরণ।  এটা যদি খুব দ্রুত করা সম্ভব হয় তাহলে ই-কমার্সের দুই সেক্টর খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করবে বলে আশা করা যায়।

মূল লেখা: বুলবুল আনোয়ার