
বাংলাদেশের নদীগুলো পলিতে ভরাট হয়ে প্রতিবছর বন্যা, ভাঙন ও নৌ-চলাচল বন্ধের কারণ হচ্ছে। এই সংকট সমাধানে সিঙ্গাপুর অন্তত চারবার প্রস্তাব দিয়েছিলো: নিজ খরচে ড্রেজিং করবে, বালু নিয়ে যাবে, সঙ্গে রয়্যালটিও দেবে। কিন্তু প্রতিবারই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত দুর্বলতায় তা ভেস্তে যায়।
-
সিঙ্গাপুর কী দিতে চেয়েছিলো?
সিঙ্গাপুর ল্যান্ড রিক্লেমেশনের জন্য বছরে কোটি কোটি ঘনমিটার বালু আমদানি করে। বাংলাদেশকে দেওয়া প্রস্তাব ছিলো তিন ধাপে:
- বিনামূল্যে ড্রেজিং: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ড্রেজিংয়ের পুরো খরচ সিঙ্গাপুর বহন করবে।
- বালু পরিবহন ও ক্রয়: ড্রেজিংয়ে ওঠা বালু সিঙ্গাপুর নিজ খরচে জাহাজে তুলে নিয়ে যাবে।
- রয়্যালটি প্রদান: প্রতি ঘনমিটার বালুর জন্য বাংলাদেশকে রয়্যালটি দেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালের কমিটির হিসাবে, ১ কোটি টন বালু রপ্তানি করে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব ছিলো।
-
প্রথম দফা: ১৯৯১-১৯৯৬ বিএনপি সরকার
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের সময় সিঙ্গাপুর প্রথম প্রস্তাব দেয়। তখন বালু রপ্তানির নীতিমালা ছিলো না। পানিসম্পদ, বিআইডব্লিউটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় হয়নি। Eco-Business-এর রিপোর্টে উল্লেখ আছে, মালয়েশিয়া ১৯৯৭ সালে এবং ইন্দোনেশিয়া ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুরে বালু রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। ওই সময় বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের নাম আলোচনায় আসে, কিন্তু চুক্তি হয়নি।
-
দ্বিতীয় দফা: ২০০৭-২০০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকার
সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিঙ্গাপুর আবার আগ্রহ দেখায়। Wikipedia-র ‘Sand smuggling in Southeast Asia’ নিবন্ধে বলা আছে, ইন্দোনেশিয়া ২০০৭ সালে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পর সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের দিকে ঝোঁকে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল ম্যান্ডেট ছিলো “সুষ্ঠ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা।” বড় অর্থনৈতিক চুক্তি তাদের এখতিয়ারের বাইরে ছিলো। তাই প্রস্তাব আলোচনার টেবিলেই থেকে যায়।
-
তৃতীয় দফা: ২০১৪ সাল, আওয়ামী লীগ সরকার
২০১৪ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৮ সদস্যের কমিটি করে। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ Eco-Business-এ প্রকাশিত ‘Committee identifies eight rivers to export sand’ রিপোর্ট অনুযায়ী, কমিটি পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, গোমতী ও ফাজিলপুর খাল চিহ্নিত করে রপ্তানির জন্য।
Eco-Business-এর ওই রিপোর্টেই আরও বলা হয়, ২২ জুলাই ২০১৪ বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন কমিটি গঠন করেন। সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে রপ্তানির জন্য বেশ কয়েকজন রপ্তানিকারক ইতিমধ্যে আবেদনও করেছিলো। স্থানীয় রপ্তানিকারকরা ১ কোটি টন বালু রপ্তানি করে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনার কথা জানায়। কিন্তু “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন” দুর্বল, পরিবেশ ছাড়পত্র জটিলতা, আর স্থানীয় বালু সিন্ডিকেটের বাধায় চুক্তি হয়নি।
-
চতুর্থ দফা: ২০১৭ সালের আলোচনা
১৪ জুলাই ২০১৭ The Daily Star-এর ‘Bangladesh should stop river dredging’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের উচিত “সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে রিক্লেমেশন বালু রপ্তানির জন্য স্বল্পমেয়াদী অপারেশন দ্রুত শেষ করা”। অর্থাৎ ২০১৭ সালেও রপ্তানির পরিকল্পনা চলছিলো।
একই বছর Prothom Alo-র ‘ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বালু বিদেশে রপ্তানি?’ মতামত কলামে প্রশ্ন তোলা হয়, “সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপ যে কারণে বালু আমদানি করতে চায়, সেই একই কারণে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের নতুন ভূমি গড়ে তুলে আয়তন বৃদ্ধির জন্য বালুর দরকার নেই?”
The Daily Star-এর ২০১৭ সালের ওই রিপোর্টেই আরও বলা হয়, কম্বোডিয়া সিঙ্গাপুরে বালু রপ্তানি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে কারণ ড্রেজিংয়ে “immense environmental damage” হয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন। শেষ পর্যন্ত পরিবেশগত ঝুঁকি ও নীতিগত অস্পষ্টতায় ২০১৭-এর উদ্যোগও থেমে যায়।
-
ফলাফল
সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে মিয়ানমার, ফিলিপাইন থেকে বালু নেয়। ২০২৫ সালের ২০ মার্চ The Business Standard-এর রিপোর্ট জানায়, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর অবৈধ বালু উত্তোলন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোস্ট গার্ড ৭৬টি ড্রেজার ও ১০৬টি বাল্কহেড জব্দ করেছে। সরকার বৈধ বালুমহাল থেকে বছরে মাত্র ১ কোটি টাকা রাজস্ব পায়।
উপসংহার
৯০-এর বিএনপি, ২০০৭-০৮ তত্ত্বাবধায়ক, ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগ, এমনকি ২০১৭ সালেও — চারবার সিঙ্গাপুরের প্রস্তাব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভেস্তে গেছে। Eco-Business ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪, The Daily Star ১৪ জুলাই ২০১৭, Prothom Alo, The Business Standard ২০ মার্চ ২০২৫ — সব রিপোর্টই এটা নিশ্চিত করে। সমন্বিত নীতি না হলে ভবিষ্যতেও এমন সুযোগ হাতছাড়া হতেই থাকবে।