Tags

, ,

দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত অবস্থায় উপনীত হলেও অবকাঠামোগত দূর্বলতা এবং যথাযথ প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানের অভাবে সম্ভাবনাময় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আশাপ্রদ নয়। ব্যাপক আগ্রহ এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের প্রবেশ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অতিবাহিত হলেও কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে খুবই স্বল্প পরিসরে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশসমূহে কলসেন্টার শিল্পে যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে তখন বাংলাদেশের কলসেন্টার শিল্পে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক দেরি হলেও বাংলাদেশ কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশ করায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন কলসেন্টার শিল্পে অচিরেই বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক অবস্থায় উপনীত হবে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে কতটা কার্যকর এই বিষয়ে এখনও তেমন সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারেনি আগ্রহী অনেক ব্যক্তি।

এই কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জোরগলায় বলা হলেও আমাদের দেশের দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই ব্যবসার ক্ষেত্রে কতটুকু সহায়ক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি। কেননা গত বছর লাইসেন্স প্রদান করা হলেও তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রাপ্ত লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে শর্ত প্রদান করা হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই পরবর্তী পর্যায়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানেরই কলসেন্টার শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশদ জ্ঞান না থাকায় প্রাথমিকভাবেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সেই সাথে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ভিত্তিক দুর্বল অবকাঠামো বিষয়টিকে করে তুলেছে জটিল অবস্থায়। কেননা, উচ্চমূল্যের বিনিময়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইন্টারনেটের গতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তা নিরবিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ করে বিদেশের ক্লায়েন্ট নির্ভর এই কলসেন্টার শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সেই সাথে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে কলসেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেননা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যতিত কলসেন্টার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কলসেন্টার শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। জেনারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে গ্রহণ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানী তেলের উচ্চমূল্য বিষয়টি করে তুলেছে ব্যয়বহুল।

সেই সাথে একটি বিষয়ে কলসেন্টার শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনে রাখা উচিত, কলসেন্টার ব্যবসাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে কথাটি কিন্তু সত্যি। কিন্তু তার জন্য শুধু যে লাইসেন্স গ্রহণ করে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে তা নয়। আউটসোর্সিং-এ নিজেদের অবস্থান কেমন হবে সে সম্পর্কে পূর্বেই সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কেননা এই শিল্পে যেমন বিপুল পরিমান অর্থ আয় করার সুযোগ রয়েছে তেমনি এই কলসেন্টার ব্যবসা কিন্তু খুবই নাজুক ব্যবসা হিসেবে পরিচিত। সামান্যতম সেবার ত্রুটি বিচ্যুতি এই ব্যবসাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই সচেতনভাবে নিজেদেরকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুত করে এই ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা উচিত। সেই সাথে কলসেন্টার ব্যবসা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন করতে হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আমাদের বাংলাদেশে যে কোন নতুন প্রযুক্তি প্রবেশের সময় বেশ হৈচৈ হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সে বিষয়টি ধীরে ধীরে কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়ে উঠে না। পূর্বে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি হয়ে থাকায় অনেকের মধ্যেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তুমুল আলোচিত কলসেন্টার-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি কোন অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই কলসেন্টার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মাত্র ৪শত প্রতিষ্ঠানের কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের মন্থর সূচনা বলে অনেকেই মনে করছে। তিনটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ২৯২টি, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৬৪টি এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৫১টি প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করায় যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান বিহীন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করে। প্রায় ৪শত উদ্যোক্তাকে কলসেন্টার স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫টি কলসেন্টার কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং নানাবিধ জটিলতার কারণে ইতোমধ্যে ২৬টি কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের লাইসেন্স বিটিআরসি’র নিকট ফিরিয়ে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ৮টি প্রতিষ্ঠান এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার ৮টি প্রতিষ্ঠান। কেননা, যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়বহুল হওয়ায় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা হচ্ছে আমাদের দেশে এখনো দুর্বল অবকাঠামোর বিষয়টিকে। ইন্টারনেটের ব্যবহারের উচ্চমূল্য এবং ঘনঘন সংযোগ বিচ্যুতির ঘটনা কলসেন্টার ব্যবসাতে বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকে। কেননা উন্নত বিশ্ব হতে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে আনিত কাজ সময় মতো শেষ করতে না পারলে কলসেন্টার খাতে কাজের অর্ডারই বাতিল হয়ে যায়। ফলে কলসেন্টার খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা দূরূহ হয়ে থাকে।

কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানের সময় বলা হয়েছিল ২০০৯ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে কলসেন্টার ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ যদি এর এক শতাংশ বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে শুধু কলসেন্টারের মাধ্যমেই অন্তত ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করা সম্ভব যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ-এর চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে স্মার্ট টেকনোলজিস অন্যতম। স্মার্ট টেকনোলজিস-এর জেনারেল ম্যানেজার মোঃ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘প্রায় ৮ মাস আগে লাইসেন্স গ্রহণ করার মাধ্যমে আমাদের ২৫ সিটের কলসেন্টার স্থাপন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এক মাস আগে চালু করা হয়েছে আমাদের কলসেন্টার। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় শুধু দিনের বেলা ১০ জন কলসেন্টার কর্মীর মাধ্যমে আমরা কলসেন্টার সেবা প্রদান করে চলেছি। আমাদের ক্লায়েন্ট মূলত দুবাই ভিত্তিক। আমরা দুবাই’তে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা টুইনমস এর সকল পণ্য সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করে চলেছি। এই সেবা প্রদানে আমাদের কলসেন্টারে বর্তমানে রয়েছে ৮জন ইংরেজি মাধ্যম থেকে পাসকৃত ব্যক্তি। প্রাথমিক অবস্থায় ই-ওয়ান সংযোগ না থাকলেও বর্তমানে তা চালু রয়েছে। যদিও আমরা বর্তমানে আইপি দিয়ে কলসেন্টার সেবা পরিচালনা করছি। আমি মনে করি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলসেন্টার শিল্পের অনুরূপ বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কলসেন্টার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কলসেন্টার সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। সেই সাথে বিদ্যুত আসা যাওয়ার সমস্যা, ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাব এবং বায়ার খুঁজে পাওয়ার জটিলতা এক্ষেত্রে কলসেন্টার কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে থাকে। কলসেন্টার পরিচালনায় বাংলাদেশ সফল না ব্যর্থ হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে আমি মনে করি।’ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কলসেন্টার চালু করা হাইটেক আইটি সলিউশন’র সিইও এ কে এম ফজলুল হক খোকন। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রে টেলি মার্কেটিং সাফল্যজনকভাবে করে চলেছি। ২০ আসন বিশিষ্ট্য কলসেন্টার স্থাপনে আমাদের ৩০-৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। শুধু মাত্র সফটওয়্যার এবং সার্ভার ক্রয়ের ক্ষেত্রেই ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সেই সাথে আইপিএলসি লাইন নিতে প্রয়োজন হয় ৩-৪ লাখ টাকা। ফলে কলসেন্টার স্থাপনের যে ব্যয় তা অনেক লাইসেন্স গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্প গড়ে উঠতে দেরি হচ্ছে। হাইটেক স্যাটেলাইটের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী মাহফুজুল হক বাংলাদেশে হাইটেক আইটি সলিউশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান হাইটেক স্যাটেলাইটের যুক্তরাষ্ট্রে ডিশ টিভি এবং ডিরেক্ট টিভির সেবা প্রদানের ব্যবসা পরিচালনার সুবাদে আমরা বাংলাদেশ থেকেই কলসেন্টারের মাধ্যমে এই বিষয়ে সাফল্যের সাথে টেলিমার্কেটিং করে চলেছি। সেই সাথে অস্ট্রেলিয়াতে বিভিন্ন ধরনের টেলিমার্কেটিং সেবা প্রদান করে চলেছি যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওয়েব নির্ভর সেবা এবং বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা সংক্রান্ত। আমাদের কাজের চাহিদার তুলনায় কলসেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দক্ষ জনবল এবং বিদ্যুত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চমূল্যের বেতন প্রদানে আমরা সম্মত হলেও ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মী প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে টেলিমার্কেটিংয়ে মেয়েদের অগ্রাধিকার থাকলেও ইউরোপ আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সময় পার্থক্যের কারণে সাধারণত রাতের শিফটে বাংলাদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের কাজের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে।’ বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা অন্যতম প্রতিষ্ঠান ওয়ান কলের কলসেন্টার সুপারভাইজার মিথিলা তাদের কলসেন্টার সম্পর্কে বলেন, ‘কলসেন্টার শিল্পে দ্রুত উন্নতির জন্য এখাতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানে আরও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলসেন্টার বিষয়ে শর্ট কোর্স চালু, ইংরেজিতে কথা বলতে দক্ষতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার ভিত্তিক বিশেষ জোন গড়ে তোলা এবং কলসেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয় নিশ্চিত করে একজন উদ্যোক্তার কলসেন্টার চালু করা উচিত।’ যদিও কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশের লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ১০ আসনের কলসেন্টার স্থাপন করার পরেও বায়ার সমস্যা এবং ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে আমরা কলসেন্টার চালু করলেও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি অব্যাহত লোকসানের কারণে। কেননা, কার্যকরী কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে কলসেন্টারের মূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাবে বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী টেলিমার্কেটিং করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর না হওয়ায় বায়াররা অন্য দেশের কলসেন্টার প্রতিষ্ঠানকে সেই কাজ প্রদান করে থাকে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় দেরিতে বাংলাদেশে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করা হলেও এখনো কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশে অনেক মানুষই এই শিল্প সম্বন্ধে বিস্তারিত কারিগরী জ্ঞান ব্যতিরেকে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করার কারণে কলসেন্টার চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান কলসেন্টার শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে নিম্নোক্ত বিষয়াদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা
কলসেন্টারের কার্যক্রম যেহেতু ক্লায়েন্ট ভিত্তিক হয়ে থাকে সেহেতু এই সেবা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি। কেননা, টেলিমার্কেটিং কাজে নিয়োজিত একজন কলসেন্টার কর্মী যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে অবস্থানকারী ব্যক্তির সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত থাকে তখন যদি বিদ্যুত চলে যায় তবে ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার কারণে বায়াররা সেই প্রতিষ্ঠান হতে কাজ সমূহ অন্যত্র প্রদান করে থাকে। ফলে কলসেন্টার শিল্পে কাজের অর্ডারসমূহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবার নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত ইনকিউবেটর অথবা হাইটেক পার্কে কলসেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিতকরণ।

ইন্টারনেট ভিত্তিক অবকাঠামোর মানউন্নয়ন
বাংলাদেশে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ব্যান্ডউইডথ চার্জ বর্তমানের তুলনায় আরো স্বল্পমূল্যে প্রদান করতে হবে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। ইতোপূর্বে বার বার সাবমেরিন ক্যাবলে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতে সাবমেরিন ক্যাবলের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংক ঋণ
কলসেন্টার স্থাপনের অবকাঠামোগত ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিল্প স্থাপনের ন্যায় নিয়মের বেড়াজালে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কলসেন্টার শিল্পকে মূল্যায়িত করলে তা হবে এই শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ।

সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

ইশতিয়াক মাহমুদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯
ছবির সৌজন্যে : কম্পিউটার সোর্স

দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত অবস্থায় উপনীত হলেও অবকাঠামোগত দূর্বলতা এবং যথাযথ প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানের অভাবে সম্ভাবনাময় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আশাপ্রদ নয়। ব্যাপক আগ্রহ এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের প্রবেশ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অতিবাহিত হলেও কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে খুবই স্বল্প পরিসরে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশসমূহে কলসেন্টার শিল্পে যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে তখন বাংলাদেশের কলসেন্টার শিল্পে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক দেরি হলেও বাংলাদেশ কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশ করায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন কলসেন্টার শিল্পে অচিরেই বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক অবস্থায় উপনীত হবে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে কতটা কার্যকর এই বিষয়ে এখনও তেমন সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারেনি আগ্রহী অনেক ব্যক্তি।
এই কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জোরগলায় বলা হলেও আমাদের দেশের দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই ব্যবসার ক্ষেত্রে কতটুকু সহায়ক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি। কেননা গত বছর লাইসেন্স প্রদান করা হলেও তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রাপ্ত লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে শর্ত প্রদান করা হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই পরবর্তী পর্যায়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানেরই কলসেন্টার শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশদ জ্ঞান না থাকায় প্রাথমিকভাবেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সেই সাথে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ভিত্তিক দুর্বল অবকাঠামো বিষয়টিকে করে তুলেছে জটিল অবস্থায়। কেননা, উচ্চমূল্যের বিনিময়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইন্টারনেটের গতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তা নিরবিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ করে বিদেশের ক্লায়েন্ট নির্ভর এই কলসেন্টার শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সেই সাথে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে কলসেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেননা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যতিত কলসেন্টার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কলসেন্টার শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। জেনারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে গ্রহণ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানী তেলের উচ্চমূল্য বিষয়টি করে তুলেছে ব্যয়বহুল।
সেই সাথে একটি বিষয়ে কলসেন্টার শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনে রাখা উচিত, কলসেন্টার ব্যবসাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে কথাটি কিন্তু সত্যি। কিন্তু তার জন্য শুধু যে লাইসেন্স গ্রহণ করে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে তা নয়। আউটসোর্সিং-এ নিজেদের অবস্থান কেমন হবে সে সম্পর্কে পূর্বেই সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কেননা এই শিল্পে যেমন বিপুল পরিমান অর্থ আয় করার সুযোগ রয়েছে তেমনি এই কলসেন্টার ব্যবসা কিন্তু খুবই নাজুক ব্যবসা হিসেবে পরিচিত। সামান্যতম সেবার ত্রুটি বিচ্যুতি এই ব্যবসাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই সচেতনভাবে নিজেদেরকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুত করে এই ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা উচিত। সেই সাথে কলসেন্টার ব্যবসা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আমাদের বাংলাদেশে যে কোন নতুন প্রযুক্তি প্রবেশের সময় বেশ হৈচৈ হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সে বিষয়টি ধীরে ধীরে কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়ে উঠে না। পূর্বে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি হয়ে থাকায় অনেকের মধ্যেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তুমুল আলোচিত কলসেন্টার-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি কোন অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই কলসেন্টার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মাত্র ৪শত প্রতিষ্ঠানের কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের মন্থর সূচনা বলে অনেকেই মনে করছে। তিনটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ২৯২টি, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৬৪টি এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৫১টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করায় যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান বিহীন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করে। প্রায় ৪শত উদ্যোক্তাকে কলসেন্টার স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫টি কলসেন্টার কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং নানাবিধ জটিলতার কারণে ইতোমধ্যে ২৬টি কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের লাইসেন্স বিটিআরসি’র নিকট ফিরিয়ে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ৮টি প্রতিষ্ঠান এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার ৮টি প্রতিষ্ঠান। কেননা, যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়বহুল হওয়ায় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা হচ্ছে আমাদের দেশে এখনো দুর্বল অবকাঠামোর বিষয়টিকে। ইন্টারনেটের ব্যবহারের উচ্চমূল্য এবং ঘনঘন সংযোগ বিচ্যুতির ঘটনা কলসেন্টার ব্যবসাতে বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকে। কেননা উন্নত বিশ্ব হতে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে আনিত কাজ সময় মতো শেষ করতে না পারলে কলসেন্টার খাতে কাজের অর্ডারই বাতিল হয়ে যায়। ফলে কলসেন্টার খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা দূরূহ হয়ে থাকে।
কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানের সময় বলা হয়েছিল ২০০৯ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে কলসেন্টার ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ যদি এর এক শতাংশ বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে শুধু কলসেন্টারের মাধ্যমেই অন্তত ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করা সম্ভব যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ-এর চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে স্মার্ট টেকনোলজিস অন্যতম। স্মার্ট টেকনোলজিস-এর জেনারেল ম্যানেজার মোঃ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘প্রায় ৮ মাস আগে লাইসেন্স গ্রহণ করার মাধ্যমে আমাদের ২৫ সিটের কলসেন্টার স্থাপন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এক মাস আগে চালু করা হয়েছে আমাদের কলসেন্টার। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় শুধু দিনের বেলা ১০ জন কলসেন্টার কর্মীর মাধ্যমে আমরা কলসেন্টার সেবা প্রদান করে চলেছি। আমাদের ক্লায়েন্ট মূলত দুবাই ভিত্তিক। আমরা দুবাই’তে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা টুইনমস এর সকল পণ্য সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করে চলেছি। এই সেবা প্রদানে আমাদের কলসেন্টারে বর্তমানে রয়েছে ৮জন ইংরেজি মাধ্যম থেকে পাসকৃত ব্যক্তি। প্রাথমিক অবস্থায় ই-ওয়ান সংযোগ না থাকলেও বর্তমানে তা চালু রয়েছে। যদিও আমরা বর্তমানে আইপি দিয়ে কলসেন্টার সেবা পরিচালনা করছি। আমি মনে করি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলসেন্টার শিল্পের অনুরূপ বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কলসেন্টার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কলসেন্টার সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। সেই সাথে বিদ্যুত আসা যাওয়ার সমস্যা, ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাব এবং বায়ার খুঁজে পাওয়ার জটিলতা এক্ষেত্রে কলসেন্টার কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে থাকে। কলসেন্টার পরিচালনায় বাংলাদেশ সফল না ব্যর্থ হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে আমি মনে করি।’ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কলসেন্টার চালু করা হাইটেক আইটি সলিউশন’র সিইও এ কে এম ফজলুল হক খোকন। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রে টেলি মার্কেটিং সাফল্যজনকভাবে করে চলেছি। ২০ আসন বিশিষ্ট্য কলসেন্টার স্থাপনে আমাদের ৩০-৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। শুধু মাত্র সফটওয়্যার এবং সার্ভার ক্রয়ের ক্ষেত্রেই ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সেই সাথে আইপিএলসি লাইন নিতে প্রয়োজন হয় ৩-৪ লাখ টাকা। ফলে কলসেন্টার স্থাপনের যে ব্যয় তা অনেক লাইসেন্স গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্প গড়ে উঠতে দেরি হচ্ছে। হাইটেক স্যাটেলাইটের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী মাহফুজুল হক বাংলাদেশে হাইটেক আইটি সলিউশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান হাইটেক স্যাটেলাইটের যুক্তরাষ্ট্রে ডিশ টিভি এবং ডিরেক্ট টিভির সেবা প্রদানের ব্যবসা পরিচালনার সুবাদে আমরা বাংলাদেশ থেকেই কলসেন্টারের মাধ্যমে এই বিষয়ে সাফল্যের সাথে টেলিমার্কেটিং করে চলেছি। সেই সাথে অস্ট্রেলিয়াতে বিভিন্ন ধরনের টেলিমার্কেটিং সেবা প্রদান করে চলেছি যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওয়েব নির্ভর সেবা এবং বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা সংক্রান্ত। আমাদের কাজের চাহিদার তুলনায় কলসেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দক্ষ জনবল এবং বিদ্যুত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চমূল্যের বেতন প্রদানে আমরা সম্মত হলেও ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মী প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে টেলিমার্কেটিংয়ে মেয়েদের অগ্রাধিকার থাকলেও ইউরোপ আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সময় পার্থক্যের কারণে সাধারণত রাতের শিফটে বাংলাদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের কাজের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে।’ বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা অন্যতম প্রতিষ্ঠান ওয়ান কলের কলসেন্টার সুপারভাইজার মিথিলা তাদের কলসেন্টার সম্পর্কে বলেন, ‘কলসেন্টার শিল্পে দ্রুত উন্নতির জন্য এখাতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানে আরও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলসেন্টার বিষয়ে শর্ট কোর্স চালু, ইংরেজিতে কথা বলতে দক্ষতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার ভিত্তিক বিশেষ জোন গড়ে তোলা এবং কলসেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয় নিশ্চিত করে একজন উদ্যোক্তার কলসেন্টার চালু করা উচিত।’ যদিও কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশের লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ১০ আসনের কলসেন্টার স্থাপন করার পরেও বায়ার সমস্যা এবং ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে আমরা কলসেন্টার চালু করলেও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি অব্যাহত লোকসানের কারণে। কেননা, কার্যকরী কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে কলসেন্টারের মূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাবে বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী টেলিমার্কেটিং করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর না হওয়ায় বায়াররা অন্য দেশের কলসেন্টার প্রতিষ্ঠানকে সেই কাজ প্রদান করে থাকে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় দেরিতে বাংলাদেশে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করা হলেও এখনো কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশে অনেক মানুষই এই শিল্প সম্বন্ধে বিস্তারিত কারিগরী জ্ঞান ব্যতিরেকে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করার কারণে কলসেন্টার চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান কলসেন্টার শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে নিম্নোক্ত বিষয়াদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা
কলসেন্টারের কার্যক্রম যেহেতু ক্লায়েন্ট ভিত্তিক হয়ে থাকে সেহেতু এই সেবা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি। কেননা, টেলিমার্কেটিং কাজে নিয়োজিত একজন কলসেন্টার কর্মী যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে অবস্থানকারী ব্যক্তির সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত থাকে তখন যদি বিদ্যুত চলে যায় তবে ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার কারণে বায়াররা সেই প্রতিষ্ঠান হতে কাজ সমূহ অন্যত্র প্রদান করে থাকে। ফলে কলসেন্টার শিল্পে কাজের অর্ডারসমূহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবার নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত ইনকিউবেটর অথবা হাইটেক পার্কে কলসেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিতকরণ।
ইন্টারনেট ভিত্তিক অবকাঠামোর মানউন্নয়ন
বাংলাদেশে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ব্যান্ডউইডথ চার্জ বর্তমানের তুলনায় আরো স্বল্পমূল্যে প্রদান করতে হবে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। ইতোপূর্বে বার বার সাবমেরিন ক্যাবলে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতে সাবমেরিন ক্যাবলের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক ঋণ
কলসেন্টার স্থাপনের অবকাঠামোগত ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিল্প স্থাপনের ন্যায় নিয়মের বেড়াজালে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কলসেন্টার শিল্পকে মূল্যায়িত করলে তা হবে এই শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ।
সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ইশতিয়াক মাহমুদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯
ছবির সৌজন্যে : কম্পিউটার সোর্সদ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত অবস্থায় উপনীত হলেও অবকাঠামোগত দূর্বলতা এবং যথাযথ প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানের অভাবে সম্ভাবনাময় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আশাপ্রদ নয়। ব্যাপক আগ্রহ এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের প্রবেশ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অতিবাহিত হলেও কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে খুবই স্বল্প পরিসরে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশসমূহে কলসেন্টার শিল্পে যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে তখন বাংলাদেশের কলসেন্টার শিল্পে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক দেরি হলেও বাংলাদেশ কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশ করায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন কলসেন্টার শিল্পে অচিরেই বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক অবস্থায় উপনীত হবে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে কতটা কার্যকর এই বিষয়ে এখনও তেমন সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারেনি আগ্রহী অনেক ব্যক্তি।
এই কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জোরগলায় বলা হলেও আমাদের দেশের দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই ব্যবসার ক্ষেত্রে কতটুকু সহায়ক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি। কেননা গত বছর লাইসেন্স প্রদান করা হলেও তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রাপ্ত লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে শর্ত প্রদান করা হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই পরবর্তী পর্যায়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানেরই কলসেন্টার শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশদ জ্ঞান না থাকায় প্রাথমিকভাবেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সেই সাথে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ভিত্তিক দুর্বল অবকাঠামো বিষয়টিকে করে তুলেছে জটিল অবস্থায়। কেননা, উচ্চমূল্যের বিনিময়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইন্টারনেটের গতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তা নিরবিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ করে বিদেশের ক্লায়েন্ট নির্ভর এই কলসেন্টার শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সেই সাথে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে কলসেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেননা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যতিত কলসেন্টার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কলসেন্টার শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। জেনারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে গ্রহণ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানী তেলের উচ্চমূল্য বিষয়টি করে তুলেছে ব্যয়বহুল।
সেই সাথে একটি বিষয়ে কলসেন্টার শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনে রাখা উচিত, কলসেন্টার ব্যবসাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে কথাটি কিন্তু সত্যি। কিন্তু তার জন্য শুধু যে লাইসেন্স গ্রহণ করে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে তা নয়। আউটসোর্সিং-এ নিজেদের অবস্থান কেমন হবে সে সম্পর্কে পূর্বেই সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কেননা এই শিল্পে যেমন বিপুল পরিমান অর্থ আয় করার সুযোগ রয়েছে তেমনি এই কলসেন্টার ব্যবসা কিন্তু খুবই নাজুক ব্যবসা হিসেবে পরিচিত। সামান্যতম সেবার ত্রুটি বিচ্যুতি এই ব্যবসাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই সচেতনভাবে নিজেদেরকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুত করে এই ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা উচিত। সেই সাথে কলসেন্টার ব্যবসা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আমাদের বাংলাদেশে যে কোন নতুন প্রযুক্তি প্রবেশের সময় বেশ হৈচৈ হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সে বিষয়টি ধীরে ধীরে কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়ে উঠে না। পূর্বে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি হয়ে থাকায় অনেকের মধ্যেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তুমুল আলোচিত কলসেন্টার-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি কোন অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই কলসেন্টার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মাত্র ৪শত প্রতিষ্ঠানের কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের মন্থর সূচনা বলে অনেকেই মনে করছে। তিনটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ২৯২টি, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৬৪টি এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৫১টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করায় যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান বিহীন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করে। প্রায় ৪শত উদ্যোক্তাকে কলসেন্টার স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫টি কলসেন্টার কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং নানাবিধ জটিলতার কারণে ইতোমধ্যে ২৬টি কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের লাইসেন্স বিটিআরসি’র নিকট ফিরিয়ে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ৮টি প্রতিষ্ঠান এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার ৮টি প্রতিষ্ঠান। কেননা, যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়বহুল হওয়ায় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা হচ্ছে আমাদের দেশে এখনো দুর্বল অবকাঠামোর বিষয়টিকে। ইন্টারনেটের ব্যবহারের উচ্চমূল্য এবং ঘনঘন সংযোগ বিচ্যুতির ঘটনা কলসেন্টার ব্যবসাতে বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকে। কেননা উন্নত বিশ্ব হতে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে আনিত কাজ সময় মতো শেষ করতে না পারলে কলসেন্টার খাতে কাজের অর্ডারই বাতিল হয়ে যায়। ফলে কলসেন্টার খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা দূরূহ হয়ে থাকে।
কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানের সময় বলা হয়েছিল ২০০৯ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে কলসেন্টার ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ যদি এর এক শতাংশ বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে শুধু কলসেন্টারের মাধ্যমেই অন্তত ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করা সম্ভব যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ-এর চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে স্মার্ট টেকনোলজিস অন্যতম। স্মার্ট টেকনোলজিস-এর জেনারেল ম্যানেজার মোঃ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘প্রায় ৮ মাস আগে লাইসেন্স গ্রহণ করার মাধ্যমে আমাদের ২৫ সিটের কলসেন্টার স্থাপন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এক মাস আগে চালু করা হয়েছে আমাদের কলসেন্টার। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় শুধু দিনের বেলা ১০ জন কলসেন্টার কর্মীর মাধ্যমে আমরা কলসেন্টার সেবা প্রদান করে চলেছি। আমাদের ক্লায়েন্ট মূলত দুবাই ভিত্তিক। আমরা দুবাই’তে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা টুইনমস এর সকল পণ্য সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করে চলেছি। এই সেবা প্রদানে আমাদের কলসেন্টারে বর্তমানে রয়েছে ৮জন ইংরেজি মাধ্যম থেকে পাসকৃত ব্যক্তি। প্রাথমিক অবস্থায় ই-ওয়ান সংযোগ না থাকলেও বর্তমানে তা চালু রয়েছে। যদিও আমরা বর্তমানে আইপি দিয়ে কলসেন্টার সেবা পরিচালনা করছি। আমি মনে করি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলসেন্টার শিল্পের অনুরূপ বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কলসেন্টার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কলসেন্টার সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। সেই সাথে বিদ্যুত আসা যাওয়ার সমস্যা, ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাব এবং বায়ার খুঁজে পাওয়ার জটিলতা এক্ষেত্রে কলসেন্টার কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে থাকে। কলসেন্টার পরিচালনায় বাংলাদেশ সফল না ব্যর্থ হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে আমি মনে করি।’ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কলসেন্টার চালু করা হাইটেক আইটি সলিউশন’র সিইও এ কে এম ফজলুল হক খোকন। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রে টেলি মার্কেটিং সাফল্যজনকভাবে করে চলেছি। ২০ আসন বিশিষ্ট্য কলসেন্টার স্থাপনে আমাদের ৩০-৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। শুধু মাত্র সফটওয়্যার এবং সার্ভার ক্রয়ের ক্ষেত্রেই ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সেই সাথে আইপিএলসি লাইন নিতে প্রয়োজন হয় ৩-৪ লাখ টাকা। ফলে কলসেন্টার স্থাপনের যে ব্যয় তা অনেক লাইসেন্স গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্প গড়ে উঠতে দেরি হচ্ছে। হাইটেক স্যাটেলাইটের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী মাহফুজুল হক বাংলাদেশে হাইটেক আইটি সলিউশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান হাইটেক স্যাটেলাইটের যুক্তরাষ্ট্রে ডিশ টিভি এবং ডিরেক্ট টিভির সেবা প্রদানের ব্যবসা পরিচালনার সুবাদে আমরা বাংলাদেশ থেকেই কলসেন্টারের মাধ্যমে এই বিষয়ে সাফল্যের সাথে টেলিমার্কেটিং করে চলেছি। সেই সাথে অস্ট্রেলিয়াতে বিভিন্ন ধরনের টেলিমার্কেটিং সেবা প্রদান করে চলেছি যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওয়েব নির্ভর সেবা এবং বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা সংক্রান্ত। আমাদের কাজের চাহিদার তুলনায় কলসেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দক্ষ জনবল এবং বিদ্যুত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চমূল্যের বেতন প্রদানে আমরা সম্মত হলেও ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মী প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে টেলিমার্কেটিংয়ে মেয়েদের অগ্রাধিকার থাকলেও ইউরোপ আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সময় পার্থক্যের কারণে সাধারণত রাতের শিফটে বাংলাদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের কাজের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে।’ বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা অন্যতম প্রতিষ্ঠান ওয়ান কলের কলসেন্টার সুপারভাইজার মিথিলা তাদের কলসেন্টার সম্পর্কে বলেন, ‘কলসেন্টার শিল্পে দ্রুত উন্নতির জন্য এখাতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানে আরও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলসেন্টার বিষয়ে শর্ট কোর্স চালু, ইংরেজিতে কথা বলতে দক্ষতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার ভিত্তিক বিশেষ জোন গড়ে তোলা এবং কলসেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয় নিশ্চিত করে একজন উদ্যোক্তার কলসেন্টার চালু করা উচিত।’ যদিও কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশের লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ১০ আসনের কলসেন্টার স্থাপন করার পরেও বায়ার সমস্যা এবং ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে আমরা কলসেন্টার চালু করলেও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি অব্যাহত লোকসানের কারণে। কেননা, কার্যকরী কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে কলসেন্টারের মূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাবে বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী টেলিমার্কেটিং করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর না হওয়ায় বায়াররা অন্য দেশের কলসেন্টার প্রতিষ্ঠানকে সেই কাজ প্রদান করে থাকে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় দেরিতে বাংলাদেশে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করা হলেও এখনো কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশে অনেক মানুষই এই শিল্প সম্বন্ধে বিস্তারিত কারিগরী জ্ঞান ব্যতিরেকে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করার কারণে কলসেন্টার চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান কলসেন্টার শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে নিম্নোক্ত বিষয়াদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা
কলসেন্টারের কার্যক্রম যেহেতু ক্লায়েন্ট ভিত্তিক হয়ে থাকে সেহেতু এই সেবা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি। কেননা, টেলিমার্কেটিং কাজে নিয়োজিত একজন কলসেন্টার কর্মী যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে অবস্থানকারী ব্যক্তির সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত থাকে তখন যদি বিদ্যুত চলে যায় তবে ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার কারণে বায়াররা সেই প্রতিষ্ঠান হতে কাজ সমূহ অন্যত্র প্রদান করে থাকে। ফলে কলসেন্টার শিল্পে কাজের অর্ডারসমূহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবার নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত ইনকিউবেটর অথবা হাইটেক পার্কে কলসেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিতকরণ।
ইন্টারনেট ভিত্তিক অবকাঠামোর মানউন্নয়ন
বাংলাদেশে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ব্যান্ডউইডথ চার্জ বর্তমানের তুলনায় আরো স্বল্পমূল্যে প্রদান করতে হবে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। ইতোপূর্বে বার বার সাবমেরিন ক্যাবলে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতে সাবমেরিন ক্যাবলের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক ঋণ
কলসেন্টার স্থাপনের অবকাঠামোগত ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিল্প স্থাপনের ন্যায় নিয়মের বেড়াজালে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কলসেন্টার শিল্পকে মূল্যায়িত করলে তা হবে এই শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ।
সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ইশতিয়াক মাহমুদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯
ছবির সৌজন্যে : কম্পিউটার সোর্সদ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত অবস্থায় উপনীত হলেও অবকাঠামোগত দূর্বলতা এবং যথাযথ প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানের অভাবে সম্ভাবনাময় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আশাপ্রদ নয়। ব্যাপক আগ্রহ এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের প্রবেশ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অতিবাহিত হলেও কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে খুবই স্বল্প পরিসরে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশসমূহে কলসেন্টার শিল্পে যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে তখন বাংলাদেশের কলসেন্টার শিল্পে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক দেরি হলেও বাংলাদেশ কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশ করায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন কলসেন্টার শিল্পে অচিরেই বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক অবস্থায় উপনীত হবে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে কতটা কার্যকর এই বিষয়ে এখনও তেমন সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারেনি আগ্রহী অনেক ব্যক্তি।
এই কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জোরগলায় বলা হলেও আমাদের দেশের দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই ব্যবসার ক্ষেত্রে কতটুকু সহায়ক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি। কেননা গত বছর লাইসেন্স প্রদান করা হলেও তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রাপ্ত লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে শর্ত প্রদান করা হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই পরবর্তী পর্যায়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানেরই কলসেন্টার শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশদ জ্ঞান না থাকায় প্রাথমিকভাবেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সেই সাথে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ভিত্তিক দুর্বল অবকাঠামো বিষয়টিকে করে তুলেছে জটিল অবস্থায়। কেননা, উচ্চমূল্যের বিনিময়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইন্টারনেটের গতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তা নিরবিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ করে বিদেশের ক্লায়েন্ট নির্ভর এই কলসেন্টার শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সেই সাথে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে কলসেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেননা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যতিত কলসেন্টার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কলসেন্টার শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। জেনারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে গ্রহণ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানী তেলের উচ্চমূল্য বিষয়টি করে তুলেছে ব্যয়বহুল।
সেই সাথে একটি বিষয়ে কলসেন্টার শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনে রাখা উচিত, কলসেন্টার ব্যবসাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে কথাটি কিন্তু সত্যি। কিন্তু তার জন্য শুধু যে লাইসেন্স গ্রহণ করে কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে তা নয়। আউটসোর্সিং-এ নিজেদের অবস্থান কেমন হবে সে সম্পর্কে পূর্বেই সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কেননা এই শিল্পে যেমন বিপুল পরিমান অর্থ আয় করার সুযোগ রয়েছে তেমনি এই কলসেন্টার ব্যবসা কিন্তু খুবই নাজুক ব্যবসা হিসেবে পরিচিত। সামান্যতম সেবার ত্রুটি বিচ্যুতি এই ব্যবসাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই সচেতনভাবে নিজেদেরকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুত করে এই ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা উচিত। সেই সাথে কলসেন্টার ব্যবসা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আমাদের বাংলাদেশে যে কোন নতুন প্রযুক্তি প্রবেশের সময় বেশ হৈচৈ হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সে বিষয়টি ধীরে ধীরে কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়ে উঠে না। পূর্বে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি হয়ে থাকায় অনেকের মধ্যেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তুমুল আলোচিত কলসেন্টার-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি কোন অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই কলসেন্টার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মাত্র ৪শত প্রতিষ্ঠানের কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের মন্থর সূচনা বলে অনেকেই মনে করছে। তিনটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ২৯২টি, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৬৪টি এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স গ্রহণ করেছে ৫১টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করায় যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান বিহীন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করে। প্রায় ৪শত উদ্যোক্তাকে কলসেন্টার স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫টি কলসেন্টার কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং নানাবিধ জটিলতার কারণে ইতোমধ্যে ২৬টি কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কলসেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের লাইসেন্স বিটিআরসি’র নিকট ফিরিয়ে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান, হোস্টেড কলসেন্টার লাইসেন্স প্রাপ্ত ৮টি প্রতিষ্ঠান এবং হোস্টেড কলসেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার ৮টি প্রতিষ্ঠান। কেননা, যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়বহুল হওয়ায় কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা হচ্ছে আমাদের দেশে এখনো দুর্বল অবকাঠামোর বিষয়টিকে। ইন্টারনেটের ব্যবহারের উচ্চমূল্য এবং ঘনঘন সংযোগ বিচ্যুতির ঘটনা কলসেন্টার ব্যবসাতে বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকে। কেননা উন্নত বিশ্ব হতে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে আনিত কাজ সময় মতো শেষ করতে না পারলে কলসেন্টার খাতে কাজের অর্ডারই বাতিল হয়ে যায়। ফলে কলসেন্টার খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা দূরূহ হয়ে থাকে।
কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানের সময় বলা হয়েছিল ২০০৯ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে কলসেন্টার ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ যদি এর এক শতাংশ বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে শুধু কলসেন্টারের মাধ্যমেই অন্তত ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করা সম্ভব যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ-এর চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে স্মার্ট টেকনোলজিস অন্যতম। স্মার্ট টেকনোলজিস-এর জেনারেল ম্যানেজার মোঃ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘প্রায় ৮ মাস আগে লাইসেন্স গ্রহণ করার মাধ্যমে আমাদের ২৫ সিটের কলসেন্টার স্থাপন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এক মাস আগে চালু করা হয়েছে আমাদের কলসেন্টার। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় শুধু দিনের বেলা ১০ জন কলসেন্টার কর্মীর মাধ্যমে আমরা কলসেন্টার সেবা প্রদান করে চলেছি। আমাদের ক্লায়েন্ট মূলত দুবাই ভিত্তিক। আমরা দুবাই’তে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা টুইনমস এর সকল পণ্য সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করে চলেছি। এই সেবা প্রদানে আমাদের কলসেন্টারে বর্তমানে রয়েছে ৮জন ইংরেজি মাধ্যম থেকে পাসকৃত ব্যক্তি। প্রাথমিক অবস্থায় ই-ওয়ান সংযোগ না থাকলেও বর্তমানে তা চালু রয়েছে। যদিও আমরা বর্তমানে আইপি দিয়ে কলসেন্টার সেবা পরিচালনা করছি। আমি মনে করি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলসেন্টার শিল্পের অনুরূপ বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কলসেন্টার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কলসেন্টার সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। সেই সাথে বিদ্যুত আসা যাওয়ার সমস্যা, ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাব এবং বায়ার খুঁজে পাওয়ার জটিলতা এক্ষেত্রে কলসেন্টার কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে থাকে। কলসেন্টার পরিচালনায় বাংলাদেশ সফল না ব্যর্থ হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে আমি মনে করি।’ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কলসেন্টার চালু করা হাইটেক আইটি সলিউশন’র সিইও এ কে এম ফজলুল হক খোকন। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রে টেলি মার্কেটিং সাফল্যজনকভাবে করে চলেছি। ২০ আসন বিশিষ্ট্য কলসেন্টার স্থাপনে আমাদের ৩০-৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। শুধু মাত্র সফটওয়্যার এবং সার্ভার ক্রয়ের ক্ষেত্রেই ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সেই সাথে আইপিএলসি লাইন নিতে প্রয়োজন হয় ৩-৪ লাখ টাকা। ফলে কলসেন্টার স্থাপনের যে ব্যয় তা অনেক লাইসেন্স গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশে কলসেন্টার শিল্প গড়ে উঠতে দেরি হচ্ছে। হাইটেক স্যাটেলাইটের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী মাহফুজুল হক বাংলাদেশে হাইটেক আইটি সলিউশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান হাইটেক স্যাটেলাইটের যুক্তরাষ্ট্রে ডিশ টিভি এবং ডিরেক্ট টিভির সেবা প্রদানের ব্যবসা পরিচালনার সুবাদে আমরা বাংলাদেশ থেকেই কলসেন্টারের মাধ্যমে এই বিষয়ে সাফল্যের সাথে টেলিমার্কেটিং করে চলেছি। সেই সাথে অস্ট্রেলিয়াতে বিভিন্ন ধরনের টেলিমার্কেটিং সেবা প্রদান করে চলেছি যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওয়েব নির্ভর সেবা এবং বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা সংক্রান্ত। আমাদের কাজের চাহিদার তুলনায় কলসেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দক্ষ জনবল এবং বিদ্যুত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চমূল্যের বেতন প্রদানে আমরা সম্মত হলেও ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ কলসেন্টার কর্মী প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে টেলিমার্কেটিংয়ে মেয়েদের অগ্রাধিকার থাকলেও ইউরোপ আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সময় পার্থক্যের কারণে সাধারণত রাতের শিফটে বাংলাদেশের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের কাজের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে।’ বাংলাদেশে কলসেন্টার চালু করা অন্যতম প্রতিষ্ঠান ওয়ান কলের কলসেন্টার সুপারভাইজার মিথিলা তাদের কলসেন্টার সম্পর্কে বলেন, ‘কলসেন্টার শিল্পে দ্রুত উন্নতির জন্য এখাতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদানে আরও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলসেন্টার বিষয়ে শর্ট কোর্স চালু, ইংরেজিতে কথা বলতে দক্ষতা বৃদ্ধি, কলসেন্টার ভিত্তিক বিশেষ জোন গড়ে তোলা এবং কলসেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয় নিশ্চিত করে একজন উদ্যোক্তার কলসেন্টার চালু করা উচিত।’ যদিও কলসেন্টার শিল্পে প্রবেশের লাইসেন্স গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ১০ আসনের কলসেন্টার স্থাপন করার পরেও বায়ার সমস্যা এবং ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে আমরা কলসেন্টার চালু করলেও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি অব্যাহত লোকসানের কারণে। কেননা, কার্যকরী কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে কলসেন্টারের মূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দক্ষ কলসেন্টার কর্মীর অভাবে বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী টেলিমার্কেটিং করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর না হওয়ায় বায়াররা অন্য দেশের কলসেন্টার প্রতিষ্ঠানকে সেই কাজ প্রদান করে থাকে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় দেরিতে বাংলাদেশে কলসেন্টার লাইসেন্স প্রদান করা হলেও এখনো কলসেন্টার শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশে অনেক মানুষই এই শিল্প সম্বন্ধে বিস্তারিত কারিগরী জ্ঞান ব্যতিরেকে কলসেন্টার লাইসেন্স গ্রহণ করার কারণে কলসেন্টার চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান কলসেন্টার শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে নিম্নোক্ত বিষয়াদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা
কলসেন্টারের কার্যক্রম যেহেতু ক্লায়েন্ট ভিত্তিক হয়ে থাকে সেহেতু এই সেবা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি। কেননা, টেলিমার্কেটিং কাজে নিয়োজিত একজন কলসেন্টার কর্মী যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে অবস্থানকারী ব্যক্তির সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত থাকে তখন যদি বিদ্যুত চলে যায় তবে ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার কারণে বায়াররা সেই প্রতিষ্ঠান হতে কাজ সমূহ অন্যত্র প্রদান করে থাকে। ফলে কলসেন্টার শিল্পে কাজের অর্ডারসমূহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সেবার নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত ইনকিউবেটর অথবা হাইটেক পার্কে কলসেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিতকরণ।
ইন্টারনেট ভিত্তিক অবকাঠামোর মানউন্নয়ন
বাংলাদেশে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে ব্যান্ডউইডথ চার্জ বর্তমানের তুলনায় আরো স্বল্পমূল্যে প্রদান করতে হবে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। ইতোপূর্বে বার বার সাবমেরিন ক্যাবলে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভবিষ্যতে সাবমেরিন ক্যাবলের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক ঋণ
কলসেন্টার স্থাপনের অবকাঠামোগত ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ে কলসেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিল্প স্থাপনের ন্যায় নিয়মের বেড়াজালে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কলসেন্টার শিল্পকে মূল্যায়িত করলে তা হবে এই শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ।
সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের কলসেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ইশতিয়াক মাহমুদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯
ছবির সৌজন্যে : কম্পিউটার সোর্স