বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্প এখন আক্ষরিক অর্থেই মৃত। কোনো নতুন সুপারহিট অ্যালবাম নেই, নেই কোনো বড় কনসার্ট বা জাঁকজমকপূর্ণ শো—আমার জানা মতে, পুরো ইন্ড্রাস্ট্রি যেন এক জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গত সপ্তাহে বসুন্ধরা সিটিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরার সময় হঠাৎ মনে পড়লো, ওয়ারফেজ ব্যান্ডের শেষ অ্যালবামটি আমার কেনা হয়নি। বেশ একটা আবেগ নিয়ে লেভেল ৬-এর দিকে ছুটে গেলাম; মনে পড়েছিলো পুরোনো দিনের কথা, যখন এই ফ্লোরটিতে দেশি-বিদেশি গানের দারুণ কালেকশন নিয়ে বেশ কিছু চমৎকার মিউজিক শপ গমগম করতো। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি হতবাক! সব মিউজিক শপ উধাও হয়ে গেছে, আর সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন আর এক্সেসরিজের দোকান। একটু আশার আলো নিয়ে আমার বাসার কাছাকাছি উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স এবং সাঈদ গ্র্যান্ড সেন্টারে গেলাম, যেখানে একসময় নামী কিছু ক্যাসেট-সিডির দোকান ছিলো। দুর্ভাগ্যবশত, সেগুলোও পুরোপুরি হাওয়া। অনেক খোঁজাখুঁজির পর টিকে থাকা একমাত্র দোকানটির সন্ধান পেলাম, কিন্তু সেখানেও আমার কাঙ্ক্ষিত এলবামটি ছিলো না।
তাহলে একজন সঙ্গীতপ্রেমী কোথায় পাবে মিউজিক সিডি?
এই প্রশ্নটা যখন এক বন্ধুকে করলাম, সে খুব স্বাভাবিকভাবেই পরামর্শ দিলো — আমার আইএসপির এফটিপি সার্ভারে ঢুকে যেন গানটা খুঁজে নি। আমার পাঠকরা খুব ভালো করেই জানে যে আমি কখনো পাইরেটেড বা চোরাই গান শুনি না। বিশেষ করে যখন বিষয়টি বাংলাদেশি শিল্পীদের স্বার্থের সাথে জড়িত। আর আমি কোনো ধরনের পাইরেসিকে কখনোই প্রশ্রয় দিই না। স্বভাবতই, আমি এফটিপি সার্ভারে গানটি খুঁজিনি। কিন্তু বর্তমানে এটিই এখন শহরের সবচেয়ে বড় ‘টক অব দ্য টাউন’। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে তাদের আইএসপি-র কাছে সিনেমা, গান, সফটওয়্যার আর গেমসের এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। এখন আর কেবল ছোটখাটো পাড়া-মহল্লার আইএসপিগুলোই এটি করছে না; বড় বড় কর্পোরেট আইএসপিগুলোও তাদের গ্রাহকদের খুশি রাখতে এই পাইরেটেড কালেকশনের বিশাল স্তূপ মেইনটেইন করছে। অনেক ব্যবহারকারী এতে হয়তো খুবই খুশি, কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ব্যাপারটা এমন হওয়া মোটেও উচিত না।
এই পতনের শেকড় কিন্তু অনেক গভীরে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিলো একটি সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক কাঠামোর ওপর। সারগাম, সাউন্ডটেক, সঙ্গীতা বা জি-সিরিজের মতো বড় বড় রেকর্ড কোম্পানিগুলো আর্টিস্ট বা শিল্পীদের সাথে কেবল সাময়িক চুক্তিভিত্তিক কাজ করতো। অনেকসময় বিক্রি ভালো হলে আরও একটু টাকা দিতো। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন সবসময়ই দুর্বল এবং এর প্রয়োগ না থাকায়, এই চুক্তিগুলো কখনো শিল্পীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বা টেকসই কোনো ক্যারিয়ার হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। আইনি সুরক্ষার এই অভাব নব্বইয়ের দশকে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম দেয়। অডিও ক্যাসেটের জোয়ারে রাতারাতি ব্যাঙের ছাতার মতো অগণিত মিউজিক কোম্পানি গজিয়ে ওঠে। এই মৌসুমি কোম্পানিগুলো বাজারে এসে বড় জোর ১/২টা হিট গান দিতো, কিংবা ১/২টা মিক্সড অ্যালবামের ট্রেন্ডে ব্যবসা করে রাতারাতি উধাও হয়ে যেতো। ফলে ইন্ডাস্ট্রি যেমন ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তেমনি শিল্পীরাও চরমভাবে শোষিত হন।
প্রায় এক দশক আগে আমি “Who Killed the Electric Car?” নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছিলাম। সেখানে দেখানো হয়েছিলো কীভাবে পুঁজিবাদী জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো ইলেকট্রিক কারকে কখনো আলোর মুখ দেখতে দিতে চায়নি। কিন্তু আজকের দিনের দিকে তাকান: মার্কিন সরকার এখন ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য ‘ইনডাকশন চার্জিং’ প্রযুক্তিসম্পন্ন আলাদা হাইওয়ে লেন তৈরীর পরামর্শ দিচ্ছে। প্রগতির চাকা এভাবেই ঘোরে, আর এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি—একদিন আমাদের মিডিয়া বা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
তবে সেই সুদিনের জন্য আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করা জরুরী। আমাদের অন্যের বা বিদেশী কাজের কপিরাইটকেও সম্মান করতে শিখতে হবে। বাংলাদেশ একটি ছোটো দেশ, যেখানে বিপুল জনসংখ্যার মুখের খাবার জোগাতে হয়। আমরা যদি অন্যের মেধা বা কপিরাইটকে সম্মান করতে না শিখি, তাহলে বিশ্ব সম্প্রদায়ও আমাদের ঠিক একইভাবে অসম্মান করবে এবং আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান কোনো সৃষ্টি থেকে আমাদের বঞ্চিত করবে — যা আমাদের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। যতদিন না আমরা অন্যের সৃষ্টির মূল্যায়ন করতে শিখবো, ততদিন এই মিউজিক শপগুলো খালিই পড়ে থাকবে, আর আমাদের ইন্ডাস্ট্রির নীরবতা শুধুই দীর্ঘায়িত হবে।