FOSS শব্দের অর্থ হচ্ছে Free Open Source Software, যার আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় স্বাধীন এবং মুক্ত সোর্স সফটওয়্যার।
বর্তমানে সারা পৃথিবীতে FOSS-এর কথা চলছে। বিশ্বের বড় বড় OEM (original equipment manufacturer) কোম্পানীগুলি, (যেমন IBM, SUN, HP) ঝুঁকে পড়েছে FOSS-কে সমর্থন দেয়ার জন্য। কিন্তু আমরা কি আদৌ জানি কি এই FOSS এবং কেনো এই FOSS প্রচেষ্টার পেছনে সমগ্র বিশ্ব আগ্রহী হয়ে পড়েছে? FOSS প্রচেষ্টার মধ্যে কিছু অসাধারণ বিষয়ের সমন্বয় আছে যেগুলি বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের কম্পিউটার ব্যবহারকারীদর কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়, আর তাই FOSS-এর প্রতি জাগ্রত সমগ্র বিশ্ব। আমি এখানে সেই বিষয়গুলি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম:
মুক্ত সংস্কৃতি:
উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ইন্টারনেটে। ইন্টারনেট মুক্ত এবং এর কোনো অন্ত নেই। পৃথিবীতে মুক্ত কোনকিছুরই কোনো সীমা নেই। আর FOSS বিষয়টির শুরুই যখন স্বাধীন কথাটি দিয়ে, তার অর্থ পরিস্কার যে এই স্বাধীনতারও কোনো শেষ নেই।
কপিলেফট:
সাধারণত কপিরাইট আইন প্রদান করা হয় ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার জন্য। যেমন কপিরাইট আইনের আওতায় আপনি কোনোকিছু কিনলে সেটা বিতরণ করতে পারবেন না, পরিবর্তন/পরিবর্ধন করতে পারবেন না। মুক্ত সংস্কৃতির দুনিয়ায় এই কপিলেফট শব্দটি ঠিক এর উল্টো। এটা ব্যবহৃত হয় ব্যবহারকারীকে ক্ষমতা প্রদানের জন্য। এর আবিধানিক অর্থ না থাকলেও FOSS আপনাকে কপিলেফটের মাধ্যমে একটি পন্য ব্যবহারের অনুমতি তো দিচ্ছেই, সেই সাথে এটি বিতরণ, পরিবর্তন, পরিমার্জনের ক্ষমতাও প্রদান করছে। GNU GPL এবং ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স ঠিক এরকম লাইসেন্সের উদাহরণ।
মুক্ত সফটওয়্যার:
অনেকেই মুক্ত বা ফ্রি সফটওয়ার বলতে বুঝতে চান যে সেটা শুধুই ব্যবহার করার জন্য মুক্ত এবং সেটা পেতে কোনো পয়সা খরচ করতে হবে না। পশ্চিমের দেশগুলিতে একটি কথা প্রচলিত আছে “Free as in free beer” যার মানে কিছুটা এরকম যে আপনি একটি কিনলে আরেকটি ফ্রি পাবেন। আসল বিষয় সেটা না। মুক্ত বা ফ্রি বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এটা ব্যবহার, কপি, অধ্যয়ন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন এবং পুনঃ বিতরণের জন্য স্বাধীনতাকে। ১৯৪৮ সালে রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান প্রথম মুক্ত সফটওয়্যারের বিষয়টির প্রয়াস করেন এবং পরে তারই রেশ ধরে আজ এন্টারপ্রাইজ সমাধানে মুক্ত সফটওয়্যার গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
উন্মুক্ত সোর্স:
এই শব্দটির প্রকাশভঙ্গি কিছুটা মুক্ত সফটওয়্যারের মতন। প্রতিটি সফটওয়্যার তৈরী হয় কিছু কোড দিয়ে। আমরা যখন সামনে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করি, পেছনে সেই কোডগুলি মূল কাজ করে দেয়। তবে নকল হতে পারে বা চুরি হতে পারে, এবং সেটার জন্য ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে ভেবে সাধারণত এই সোর্স বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু উন্মুক্ত সোর্সের চিন্তাধারা একটু অন্যরকম। এটা ব্যবহারকারীদেরকে দেয়াই হয় পরিবর্তন পরিবর্ধন এবং পরিমার্জন করার জন্য। এর ফলে একটি প্রোগ্রামের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাগুলি উন্নত করা সম্ভব, সম্ভব সফটওয়্যারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার। ব্যবহারকারীদের নিজেদের দক্ষতা ব্যবহার করে চাহিদা মোতাবেক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নেবার স্বাধীনতা থাকে। তাই দিন দিন সফটওয়্যারের ক্ষমতা মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়।
এই ভিত্তিগুলিকে লক্ষ্য করে সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ব্যবহারের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, তার কারনে FOSS শব্দটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গ্রাহকদের/ব্যবহারকারীদের চাহিদা বা নিজেদের উদ্দ্যোগে এর পরিবর্ধন/পরিমার্জনের কারনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে FOSS এর প্রচেষ্টা। ১৯৮৪ সালে ১৯৪৮ সালে রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান প্রথম মুক্ত সফটওয়্যারের প্রয়াসকে সামনে রেখে Open Source Initiative সংক্ষেপে OSI নামের আরেকটি দল মুক্ত সফটওয়্যারের সোর্স উন্মুক্ত করার প্রয়াস করেন এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজকে আমরা পাই FOSS.
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় FOSS এর কিছু নমুনা-
- মজিলা ফায়ারফক্স – http://www.mozilla.com/firefox মাইক্রসফট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারে সিকিউরিটি জনিত বিভিন্ন সমস্যা যখন দেখা যায়, তখন ব্যবহারকারীরা নিশ্চিন্তে ফায়ারফক্স ব্যবহার করে। এটি সম্ভব হয়েছে FOSS এর জন্য। ব্যবহারকারীরা যখন কোনো সমস্যার সন্মুখীন হয়েছেন তখন হয় তারা নিজে সেটা ঠিক করেছেন বা মজলা ডেভলপারদের জানিয়েছেন এবং সেই সমস্যা সমাধান হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের ৭৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন ফায়ারফক্স ব্যবহার করেন ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য। বাংলা ভাষায় ফায়ারফক্স পাওয়া যায় http://firefox.ekushey.org সাইট থেকে।
- ওপেন অফিস – http://www.openoffice.org জাভা’র নির্মাতা সান মাইক্রোসিস্টেম প্রথমে সান অফিস নামে ছাড়লেও পরে FOSS-এর নিতিমালার অধীনে ওপেন অফিস নামে বের করে এবং কিছুদিনের মধ্যেই ব্যপক জনপ্রিয় হয়ে যায়। মাইক্রসফট অফিসের পাশাপাশি ওপেন অফিস কোনো দিক দিয়ে কম যায় না। বাংলা ভাষার ওপেন অফিস পাওয়া যাবে http://bn.openoffice.org সাইট থেকে।
নিত্য প্রয়োজনী এরকম হাজারো সফটওয়্যার পাওয়া যাবে FOSS এর আওতাভুক্ত। আমরা ইচ্ছা করলেই এগুলির ব্যবহার শুরু করতে পারি আমাদের দৈনন্দিন কম্পিউটিং-এ।
বাংলাদেশ ও FOSS
আপনার কাজের জন্য প্রয়োজন একটি এ্যপ্লিকেশন যেটা FOSS এর আওতাভুক্ত নেই, এরকম কথা নেই। ডেক্সটপ অপারেটিং থেকে সার্ভার অপারেটিং পর্যন্ত, ডকুমেন্ট কম্পোজ থেকে হিসাব নিকাস পর্যন্ত, থ্রি-ডি এ্যনিমেশন ডিজাইন থেকে ভিডিও এডিটিং পর্যন্ত প্রতিটি কাজের জন্য রয়েছে FOSS আওতাভুক্ত সফটওয়্যার।
FOSS সাধারণ অর্থেই সব দিক দিয়ে স্বাধীন। FOSS এর আওতাধীন কোনো কিছু কারও অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলির এটাই সবচাইতে বড় সুবিধা। ধরে নেয়া যাক আগামী কাল থেকে আমাদের দেশের গ্রাম পর্যায়ে প্রাইমারী স্কুলগুলিতে বাচ্চাদের কম্পিউটারের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রথমে যেই সমস্যা হবে, সেটা হচ্ছে ভাষাগত। স্কুলের বাচ্চাদের (ইংরেজী মাধ্যমের না) লেখাপড়ার মাধ্যম যেহেতু ইংরেজী না, তাই তারা প্রথমেই বুঝতে পারবে না যে কি করলে কি হবে। তাই দরকার মাতৃভাষার ইন্টারফেস বা সফটওয়্যারের চেহারা। এই ক্ষেত্রে আমাদের সরকার উদ্দ্যোগী হয়ে FOSS গুলি নির্বাচন করে সেগুলির ইংরেজী চেহারা পরিবর্তন করে বা অনুবাদ করে খুব সহজেই বাংলা করে উপস্থাপন করতে পারে এবং কচি ব্যবহারকরীরা, অনায়াসে বুঝতে পারবে কি করলে কি হবে। এই অনুবাদের কাজটিকে বলা হয় লোকালাইজেশন বা সংক্ষেপে L10N. FOSS নিতিমালায় যেহেতু কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই অনায়াসে এই পরিবর্তন সাধন করে ব্যবহার উপযোগী করে নেয়া যায়।
আরও একটি সুবিধা হলো মূল্য। সরকারী উদ্দ্যোগে যদি দেশের প্রতিটি সরকারী/বেসরকারী/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারায়ন করা হয়, তাহলে ওপারেটিং সিস্টেম, অফিস স্যুট এর লাইসেন্স কিনতে প্রচুর অর্থলগ্নি করতে হবে। আর সেগুলি যদি বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। উন্নয়নশীল দেশে যদি সফটওয়্যার কেনার পেছনে টাকা নষ্ট (!) করা হয়, তাহলে সেটা সত্যই বেদনা দায়ক। তাই আমাদের সকলেরই প্রচেষ্ট থাকা উচিৎ FOSS এর ব্যবহার।
বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি ছাড়াও উন্নত দেশগুলি FOSS নিয়ে বেশ সচেতন, আর সেই সচেতনতার প্রভাবেই FOSS এর বহুমূখী অবস্থান তৈরী হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে লোকালাইজেশনের ব্যপক সুবিধা, বিনামুল্যে প্রপ্তি, FOSS এর প্রসারের মূল কারন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এমনকি শ্রীলঙ্কাতে ব্যপকভাবে FOSS এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। সরকারী/বেসরকারী উদ্দ্যোগে FOSS এর ব্যপক প্রসার ঘটে চলেছে বিশ্বজুড়ে।
আমাদের দেশের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “অঙ্কুর” http://www.ankurbangla.org সম্পুর্ন নিজেদের উদ্দ্যোগে বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন FOSS-এর অনুবাদ বাংলায় করে আসছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিখ্যাত অফিস স্যুট ওপেন অফিস http://bn.openoffice.org জনপ্রিয় ইন্টারনেট ব্রাউজার মোজিলা ফায়ারফক্স http://firefox.ekushey.org এছাড়াও লিনাক্সের প্রচলিত ডেস্কটপ, KDE, Gnome এর অনুবাদ, ম্যানড্রেক/ম্যানড্রিভা লিনাক্স ও তার এ্যপ্লিকেশনগুলির বাংলা অনুবাদ, সুসি লিনাক্স ও তার এ্যপ্লিকেশনগুলির বাংলা অনুবাদ, রেডহ্যাট/ফেডোরা লিনাক্স ও তার এ্যপ্লিকেশনগুলির বাংলা অনুবাদ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে http://www.ankurbangla.org/projects/ সাইট থেকে। অঙ্কুরের সাথে জড়িত বাংলাদের এবং ভারতের স্বেচ্ছাসেবীরা এই কাজ করে যাচ্ছেন।
পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলির মতন বাংলাদেশ সরকার যদি FOSS নিয়ে একটু সোচ্চার হয় তাহলে “অঙ্কুর” এর মতন একটি প্রতিষ্ঠান FOSS কে বাংলাদেশের প্রতিটি কম্পিউটারে নিয়ে যেতে পারতো এবং দেশের ICT তাতে করে অনেক দিক দিয়েই উপকৃত হতো।
অমি আজাদ
বাংলা কম্পিউটিং এবং লোকালাইজেশন প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবী
অঙ্কুর: http://www.ankurbangla.org
একুশে: http://www.ekushey.org
অমি ভাই আমাদের প্রযুক্তি ফোরাম থেকে সফটওয়্যার ফ্রিডম ডে উপলক্ষ্যে একটা অনলাইন ম্যাগাজিন বের করতে চাই। আপনার এই লেখাটি নিতে চাই। পারমিশন চাই 🙂
আমাদের প্রযুক্তি টিম,
পক্ষ্যে সবুজ আকা মানচু
First comment on this post!!! How that is possible!!!
Well you can publish this anywhere. 🙂 Just don’t forget the credit and source URL.
আমার নাম দিবাকর আমি বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করতে ভালোবাসি আর ভালোবাসি টুম্পাকে কারণ সে আমার সব থেকে ভালো বন্ধু
wow… nice Comment… heheheheheheheh
অমি ভাই, বাংলাদেশের মানুষকে চুরির চাইতে ফ্রী ভাল, এই কথা বলে লাভ নাই, অন্তত এখনো সেই দিন আসেনি। প্রথমত, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ জানেই না, দোকান থেকে যেই উইন্ডোজ তাদেরকে ইন্সটল করে দেয়া হয়, তা দুই নম্বর।
এছাড়া, বেশ কয়েক জনকে ফ্রী OS যেমন লিনাক্স (উবুন্টু, ওপেনসুসী ইত্যাদি) -এর ব্যাপারেও উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছি। নাহ, তারা উইন্ডোজ এই খুশি। তারা নতুন কিছু শিখতে চায় না।