জাবেদ করিম ১৯৭৯ সালে পূর্ব জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের এক বছর পর তার পিতা-মাতা পশ্চিম জার্মানি চলে যান। সেখান থেকে ১৯৯২ সালে মিনেসোটার সেন্টপলে চলে যান। তার পিতা নাঈমুল করিম থ্রিএমের গবেষক। তার মা ক্রিস্টাইন করিম ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার বায়োকেমিস্ট্রির সহকারী অধ্যাপক। প্রযুক্তি ও জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে পুত্রের আগ্রহ প্রসঙ্গে মিসেস করিম বলেন, ‘নতুন জিনিস উদ্ভাবন করা, নতুন জিনিস সম্পর্কে জানাটাই আমাদের জীবন।’ আর তারই ফসল পে-প্যাল এবং ইউটিউব।

পাঠক আপনারা সকলেই জানেন যে সম্প্রতি গুগল্ ১.৬৫ বিলিয়ন মার্কন ডলারে ইউটিউবকে কিনে নিয়েছে এবং ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায় ২০০২ সালে ই-বে কিনে নিয়েছিলো পে-প্যাল কে। আর এই দু’টি কোম্পানীর নেপথ্যে আছেন আমাদের দেশের সোনার ছেলে জাবেদ করিম। পে-প্যাল সম্পর্কে বিষদ তথ্য আমরা যোগাড় করতে না পারলেও জেনেছি যে ইউটিউবের তিনজন প্রতিষ্ঠাতা মালিকের একজন জাবেদ। ইউটিউবের জন্মলগ্নে তিনি শুধু উপস্থিতই ছিলেন না, যাবতীয় প্রযুক্তিগত পরামর্শও দিয়েছিলেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ভিডিও শেয়ার করতে পারে এমন একটি ওয়েব সাইটের ব্যাপারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছিলেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি ব্যবসার চেয়ে একাডেমিক দিকটাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন বেশি।

জাবেদের জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলার কিংবা এরূপ অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে স্টানফোর্ডে মাস্টার্স ডিগ্রিতে অধ্যয়ন করাটা কোনো ব্যাপারই ছিল না। তার পিতা-মাতা সাদ হার্লি ও স্টিভেন কোম্পানিটি খুঁটি গেড়ে যখন ইন্টারনেট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তখন জাবেদ ধীরস্থিরচিত্তে ক্লাসে ফিরে গিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। স্টানফোর্ড কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড এল ডিল বলেন, “করিমের পছন্দ অসাধারণ ভালো। ব্যবসায় সাফল্য সত্ত্বেও তিনি এখানে মাস্টার্স প্রোগ্রাম সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত অটুট রেখেছেন। এখানকার ঐতিহ্য ভিন্ন। এখানকার ছাত্ররা ব্যবসার উদ্দেশ্যে স্টানফোর্ড ত্যাগ করছে, যেটা করিম করেননি।”

২৭ বছর বয়সের করিম এভাবে প্রাচুর্য হাতে পেয়ে দৃশ্যত প্রফুল্ল বোধ করতে পারেননি। তাই তিনি গুগল যখন ইউ টিউব ক্রয় সম্পন্ন করে তখন কোনোরূপ মতামত দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তিনি শুধু এটুকু বলেছিলেন, তিনি কোম্পানির সর্ববৃহৎ ব্যক্তি শেয়ারহোল্ডার। যদিও কোম্পানির অপর দুই পার্টনারের চেয়ে কম অংশের মালিক তবে কারবারটা এতটাই বিশাল যে, কম অংশের মালিক হলেও তারপরও তার অংশ বিশাল।

পে-প্যালে কাজ করার সময়ই সেখানকার অপর দুই সহকর্মী হার্লি ও চেনে সঙ্গে দেখা করেছিলেন করিম। ই-বে এক দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পে-প্যালকে কিনে নিলে জাবেদ করিম কয়েক মিলিয়ন ডলার পেয়ে যান। পে-প্যাল বিক্রির পর হার্লি ও চেন অন্য একটি কোম্পানি খোলার কথা বলতেন। ২০০৫ সালের গোড়ার দিকে তারা তিনজনেই পে-প্যাল ত্যাগ করেন। এরপর তারা স্টানফোর্ডের কাছে ম্যাক্সের অপেরা ক্যাফেতে গভীর রাত পর্যন্ত নানা জটিল বিষয়ে আলোচনা করতেন। করিম বলেন, তিনিই প্রথম তাদের কাছে ভিডিও শেয়ারিং ওয়েব সাইটের ধারণাটা তুলে ধরেন। ইউটিউব তারই চিন্তার ফসল। তবে এর পেছনে হার্লি ও চেনের আর্থিক অবদানও কম ছিল না।

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে যখন এই সাইটটি চালু করা হয় তখন জাবেদ ও তার পার্টনাররা এ ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন, তিনি একজন কর্মচারী হবেন না, তিনি হবেন একজন অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা। তিনি কোনো বেতন-ভাতা, সুবিধা এমনকি কোনো আনুষ্ঠানিক পদবি পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। জাবেদ বলেন, তাকে মনোনিবেশ করতে হয়েছিল তার লেখাপড়ার প্রতি। এই সিদ্ধান্তের অর্থ ছিলো যে, কোম্পানিতে তার অংশীদারিত্ব সীমিত থাকবে। সিকুইয়া পার্টনার রোয়েলঅফ বোথা, যিনি ইউটিউবে বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তিনি চাচ্ছিলেন, করিম তাতে থেকে যায়। বোথা বলেন, “আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমরা তাকে কোম্পানির অংশীদার হিসেবে রেখে দেই। কেননা, তিনি খুবই সৃজনশীল। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি তার সিদ্ধান্ত বিলম্বে কার্যকর করার জন্য।”

হাইস্কুলে লেখাপড়া শেষ করার পর জাবেদ করিম আরবানা শ্যাম্পেন এট ইলিনয় যান। সেখানে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণে একটি হচ্ছে এটা সেই বিদ্যাপীঠ যেখানে নেটস্ক্যাপ, মার্ক এনড্রেসেন ও অন্যরা, যারা প্রথম জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজারের জন্ম দিয়েছিলেন। তারা সেখানে অধ্যয়ন করেছিলেন। ২০০০ সালে করিম জুনিয়র ক্লাসে পড়ার সময় লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে সিলিকন ভ্যালির উদ্দেশে পাড়ি জমান। সেখানেই তিনি পে-প্যাল যোগদান করেন। পরে তিনি অনলাইনে কিছু কোর্স অধ্যয়ন করে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি লাভ করেন। অনলাইনের পাশাপাশি তিনি সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটিতেও কিছু পড়াশোনা করেন।

জাবেদ বলেন, “গুগল্-এর সঙ্গে কথাবার্তার বিষয়টি তাকে গত সপ্তাহে প্রথম জানানো হয়। যদিও তিনি অপর দুই সহপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। সোমবার তাকে একুইজিশন দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য উইলসন সনসিনি গুডরিক অ্যান্ড রোসাটিতে পালো আলটো ল’ অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে হার্লি ও চেন তাকে অভিনন্দন জানান। এই একুইজিশন প্রাইসের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে করিম বলেন, মূল্যটা আমার কাছে মানানসই বলে মনে হয়েছে।

সূত্র: ইউএসএ টু-ডে